লক্ষ্মীপুরে নির্বাচনি জনসভায় জামায়াত আমিরের বক্তব্য: দেশে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুর

লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক বিশাল ও সুসংগঠিত নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য প্রদানকালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-র আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা করেছেন যে, দেশের সর্বস্তরের আপামর জনগণ আজ স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে। তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, লক্ষ্মীপুরের পবিত্র মাটি ও ঘাস একসময় শহীদদের তাজা রক্তে প্লাবিত হয়েছিল এবং রক্তক্ষয়ী জুলাই আন্দোলনের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক সাফল্যের কারণেই আজ দেশের প্রতিটি নাগরিক স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করার ও কথা বলার অধিকার ফিরে পেয়েছে। শুক্রবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই বৃহৎ মহাসমাবেশে তিনি ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, যাদের অসীম সাহস, মহান আত্মত্যাগ এবং আত্মোৎসর্গের বদৌলতে জনগণ আজ কারামুক্তি পেয়েছে এবং স্বাধীনতার কাঙ্ক্ষিত সুফল প্রত্যক্ষ করতে পারছে, তাদের অবদানকে অস্বীকার করা কিংবা তাদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করা অত্যন্ত লজ্জাজনক, দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত একটি আচরণ। এই ধরনের ধৃষ্টতা কোনোভাবেই দেশবাসী মেনে নেবে না বলে তিনি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও সুশাসনের রূপরেখা

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরে জামায়াতে ইসলামী-র শীর্ষ নেতা উল্লেখ করেন, যে কলঙ্কিত রাজনৈতিক কালচার দীর্ঘদিন ধরে গোটা দেশকে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ভয়ভীতি ও চরম নৈরাজ্যের মাধ্যমে অস্থির করে রেখেছিল এবং সমাজের মা-বোনদের মান-সম্মান ক্ষুণ্ন করেছিল, দেশের সচেতন জনগণ এখন সেই জরাজীর্ণ ও শোষণমূলক রাজনীতির অবসান চায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে। ডা. শফিকুর রহমান জনগণের উদ্দেশ্যে সার্বিক সুশাসনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরে বলেন, “আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বদা আপসহীন ও কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছি। আমরা অতীতের মতো কখনোই মামলা বাণিজ্যে লিপ্ত হবো না এবং জনগণের সুনির্দিষ্ট সমর্থন ও রায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে প্রদত্ত প্রতিটি ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে।” তিনি আরও পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ আর কোনোদিন অতীতে ফিরিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টায় পেছনের দিকে দৌড়াবে না, বরং সর্বস্তরের নাগরিকের অংশীদারিত্বে এক শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দেশ গড়ে তোলা হবে।

যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান ও নারীদের যথাযথ অধিকার

দেশের ভবিষ্যৎ যুবসমাজের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, তরুণদের কেবল তথাকথিত বেকার ভাতা প্রদান করে অলস ও অপমানিত করে রাখা হবে না, বরং প্রতিটি যোগ্য ও দক্ষ তরুণের হাতে সম্মানজনক কর্মসংস্থান তুলে দিয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা হবে। দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তরুণদের হাতে তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি জানান, তাঁদের ১১ দলীয় ঐক্য জোটের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে শতকরা ৬২ ভাগই তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল প্রতিনিধি। একইভাবে আন্দোলনে নারীদের ঐতিহাসিক ও বলিষ্ঠ ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি দিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সমাজের মা-বোনদের নিরাপত্তা ও সর্বোচ্চ সম্মান নিশ্চিত করা হবে। ধর্ম, বর্ণ কিংবা আঞ্চলিক বৈষম্যের উর্ধ্বে উঠে দেশের প্রতিটি মানুষের সমান আইনি ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করাই হবে তাঁদের মূল রাজনীতি।

পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের আশ্বাস দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে অবৈধ উপায়ে দেশ থেকে বিদেশে পাচার করা বিপুল অংকের সমুদয় অর্থ কঠোর ব্যবস্থার মাধ্যমে ফিরিয়ে এনে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতিতে সরাসরি কাজে লাগানো হবে। বিশেষ করে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে উপকূলীয় মেঘনা নদীর বাঁধ নির্মাণ এবং অবহেলিত এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে সমতার ভিত্তিতে আমাদের সুদৃঢ় বন্ধুত্ব থাকবে, তবে কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রভূত্ব বা আধিপত্য কখনোই বাংলাদেশ বরদাশত করবে না।” উক্ত বিশাল জনসভায় জেলা নেতৃবৃন্দের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় ও জোটভুক্ত বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন।

#রাজনীতি #বাংলাদেশ #সংবাদ #নির্বাচন