শাপলা চত্বর গণহত্যার বিচার: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্তের অগ্রগতি

২০১৩ সালের ৫ মে মধ্যরাতে রাজধানীর মতিঝিল এলাকার ঐতিহাসিক শাপলা চত্বর সংলগ্ন স্থানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সংঘটিত ভয়াবহ ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে কেবল কওমি মাদরাসার কোমলমতি ছাত্র ও শিক্ষকগণই নন, বরং অসংখ্য নিরীহ, সাধারণ ও শ্রমজীবী মানুষও নির্মম গণহত্যার নিষ্ঠুর শিকার হয়েছিলেন। এই বর্বর ও হৃদয়বিদারক ঘটনায় জড়িত সকল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অপরাধী, মূল নির্দেশদাতা এবং তা বাস্তবায়নকারীদের অনতিবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সুদৃঢ় দাবি জানিয়েছে ধর্মভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নবনিযুক্ত চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ ও আলোচনা শেষে উপস্থিত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের নিকট এসব তথ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী।

প্রতিনিধিদলের বৈঠক এবং তদন্ত প্রতিবেদনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা

ঐতিহাসিক ও স্পর্শকাতর এই গণহত্যার বিচারিক প্রক্রিয়ার বর্তমান সার্বিক অগ্রগতি ও সংগৃহীত নথিপত্রের প্রকৃত অবস্থা বিস্তারিতভাবে অবহিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে হেফাজতে ইসলাম-এর ১৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে স্বশরীরে উপস্থিত হয়। ট্রাইব্যুনালের অভিজ্ঞ প্রসিকিউশন টিমের সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় নেতারা জানতে পারেন যে, বিচারকাজ বর্তমানে অত্যন্ত গতি পেয়েছে এবং তা দ্রুত গতিতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে আজিজুল হক ইসলামাবাদী গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন, “নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমাদের সুনির্দিষ্টভাবে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের নির্দেশে সংঘটিত এই ভয়াবহ ম্যাসাকারের যাবতীয় অকাট্য তথ্য-উপাত্ত, ডিজিটাল প্রমাণ, আলামত ও শক্ত আইনি দলিল ইতোমধ্যেই সংগৃহীত হয়েছে।” তিনি জানান, আগামী ৭ জুনের মধ্যে এই বহুল আলোচিত মামলার একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা সম্ভব হবে বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আশা ব্যক্ত করা হয়েছে।

লাশ গুমের অভিযোগ ও ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচারের সুদৃঢ় দাবি

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিনিধিদলের নেতারা আরও গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপন করে বলেন, সেই বিভীষিকাময় কালরাতে নিরীহ ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে নির্বিচারে হত্যা করার পর অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে লাশ গুম করা হয়েছিল। নেতাদের দাবি অনুসারে, তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িতে করে বিপুল সংখ্যক মৃতদেহ গোপন স্থানে সরিয়ে ফেলা হয়। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সহায়তায় অগণিত পরিচয়হীন ও বেওয়ারিশ লাশ গোপনে দাফন করে প্রকৃত সত্য চিরতরে ঢাকা দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। এই স্পর্শকাতর মামলার তদন্তকাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন, তদন্ত সংস্থা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

দায়ীদের বিচার নিশ্চিতকরণ ও ভবিষ্যতে স্বৈরাচার প্রতিরোধের পদক্ষেপ

আজিজুল হক ইসলামাবাদী জোর দিয়ে বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সাবেক মন্ত্রীপরিষদের সদস্যগণ, তৎকালীন পুলিশ, র‍্যাব এবং রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেসব কর্মকর্তা সেদিন নিরীহ মানুষের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিলেন, তাদের সবাইকে বিশেষ আদালতের মুখোমুখি করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, “আমরা আদালতের কাছে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরশাসক এ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর এমন নির্মম বর্বরতা চালানোর দুঃসাহস না পায়।” এই বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে চিরতরে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করে প্রতিনিধিদলটি।

#রাজনীতি #বাংলাদেশ #আন্তর্জাতিক_অপরাধ_ট্রাইব্যুনাল #বিচার