এনসিপি ও নির্বাচন কমিশন (ইসি)‑র মধ্যে প্রতীক ইস্যুতে উত্তাপ দেখা দিয়েছে—এনসিপি প্রশ্ন করেছে কোন আইনে ‘শাপলা’, ‘সাদা শাপলা’ বা ‘লাল শাপলা’ বাদ দেওয়া হলো, আর ইসি জানিয়েছে শাপলা প্রতীক দেওয়া সম্ভব নয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না থাকলেও বিভিন্ন দল নিজস্ব প্রতীকের পক্ষে মিছিল-মিটিং এবং প্রচারণা শুরু করেছে।
প্রতীক বিতর্ক ও ইসির তৎপরতা
ইসি সম্প্রতি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ১১৫টি প্রতীকের তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে নিবন্ধিত দলের ৬৯টি প্রতীকের পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত করা হয় ৪৬টি প্রতীক। একই সময়ে কিছু দলের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় তালিকায় নৌকা ও অন্যান্য প্রতীক স্থগিত দেখানো হয়েছে।
নতুন মঞ্চে আবির্ভাব করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কয়েক দফা শাপলা প্রতীক চেয়েছিল; তবে ইসি তালিকায় শাপলা রাখা হয়নি এবং দলের নিবন্ধনের চূড়ান্ত গেজেট প্রতীকের ইস্যুতে আটকে আছে। দল হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রতীক না পেলে নির্বাচনে অংশ নাও করতে পারেন তারা।
ঐতিহাসিক বিবর্তন
ধানের শীষ
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নেয়। ধানের শীষের ব্যবহার স্বাধীনতার আগেকার সময় থেকেই ছিল; ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)ও ধানের শীষ মার্কায় লড়াই করেছিল। পরে ভাসানীর নেতৃ‑বিভাগ্য অংশ বিএনপিতে যোগ দেয় এবং ধানের শীষ বিএনপির জনপ্রিয় প্রতীকে পরিণত হয়।
নৌকা
নৌকা প্রতীকেরও দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নৌকা প্রতীক ব্যবহার করছিল এবং পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ করে ১৬০টি আসনে জয়ী হয়। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় ইসি কয়েকটি প্রতীকের মতো নৌকা প্রতীকের নিবন্ধনও স্থগিত করে রেখেছে।
লাঙ্গল
লাঙ্গল মার্কা প্রথমে অবিভক্ত ভারতের কৃষক প্রজা পার্টির প্রতীকে দেখা যায়; পরে তা আতাউর রহমান খানের দল ও পরবর্তীতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রয়োগে জাতীয় পার্টির প্রতীকে রূপ নেয়। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের তালিকায় লাঙ্গল প্রতীকের মালিকানা জাতীয় পার্টির জিএম কাদের নেতৃত্বাধীন অংশের কাছে রয়েছে, অথচ অন্য অংশও প্রতীক দাবি করেছে।
দাঁড়িপাল্লা
জামায়াত ইসলামী দল স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে বহু নির্বাচনে অংশ নেয়। একটি হাইকোর্ট রিটের পর ২০১৩ সালে তাদের নিবন্ধন বাতিল ও পরে ২০১৭ সালের ৯ মার্চ নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বাদ দেওয়া হয়; ফলে ২০১৮ সালে জামায়াতকে ধানের শীষে অংশ নিতে হয়। পরবর্তীতে আন্দোলন ও আইনগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলতি বছরের জুনে আদালতের নির্দেশে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক ও নিবন্ধন ফিরে পায় দলটি এবং এখন তাদের পক্ষ থেকে প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা শুরু হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও পূর্ব উদাহরণ
অতীতের কিছু উদাহরণ দেখায় প্রতীক নিয়ে ইসি ও দলগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে—কখনও গামছা বা গমের শীষ মতো প্রতীকের অনুরোধ পরিবর্তন হয়েছে। সাবেক ইসি কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন যে সাদা-কালো ব্যালটে সাদৃশ্য থাকলে একইরকম প্রতীকের মধ্যে বিভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক এবং ইসি প্রায়ে কাছাকাছি প্রতীক বাছাই এড়িয়ে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নানামুখী ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক কারণ মিলিয়ে প্রতীক ইস্যু প্রাধান্য পেয়েছে; নির্বাচনকে ঘিরে এই প্রতীকের বিতর্ক ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে।