সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের গড়িমসি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের তীব্র অভিযোগ

ঢাকা-র কাকরাইল-এ অনুষ্ঠিত এক জাতীয় কনভেনশনে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বক্তারা অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান সরকার সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে সরে এসে জনগণের সঙ্গে চরম প্রতারণা করছে। তাদের মতে, নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে যেসব সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা থেকে বর্তমান প্রশাসন পুরোপুরি সরে দাঁড়িয়েছে। এভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সরকার অত্যন্ত কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠবে বলে বক্তারা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাই জনগণের কাঙ্ক্ষিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারকে যে কোনো মূল্যে বাধ্য করার জন্য জোর দাবি জানানো হয়।

জাতীয় কনভেনশনের মূল আলোচনা ও বিশিষ্ট বক্তাদের বক্তব্য

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই কনভেনশনে দেশের বর্তমান অর্থনীতি, জ্বালানি খাত, মানবাধিকার এবং সংবিধান সংস্কারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। উদ্বোধনী সেশনে সভাপতিত্ব করেন দলের শীর্ষ নেতা আখতার হোসেন এবং স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন সারোয়ার তুষার। প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা সরকারের সাম্প্রতিক নীতি ও সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে হান্নান মাসউদ সংসদকে সরাসরি অভিযুক্ত করে বলেন, “সংসদের প্রথম অধিবেশনের পরেই আমি স্পষ্ট বলেছি, এটি একটি প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার সংসদ।” তিনি উল্লেখ করেন, যে অধ্যাদেশগুলো সরকারের নিজস্ব ক্ষমতা বৃদ্ধি ও নিরঙ্কুশ করে, সেগুলোকে তড়িঘড়ি করে আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু যেসব অধ্যাদেশ সরকারের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারতো, সেগুলোকে পরিকল্পিতভাবে বাতিল বা ল্যাপস হতে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ শাসনামলে অনিয়মের মাধ্যমে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারRepresentatives অপসারণের অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করে সরকার মূলত নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী প্রশাসক বসানোর সুযোগ তৈরি করেছে।

সংবিধান সংস্কার ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের মারাত্মক সংকট

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯১ সালের যৌথ প্রস্তাবনার পর থেকে বিএনপি ক্ষমতায় এসে কোনো কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী অভিযোগ করেন যে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন ধ্বংস করতে কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল প্রথম থেকেই পরিকল্পিতভাবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের সিভিল-মিলিটারি ও আমলাতান্ত্রিক এলিট শ্রেণী নিজেদের একচ্ছত্র ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ হওয়ার কারণেই রাষ্ট্রীয় প্রতিটি মৌলিক সংস্কার আজ চরমভাবে ভন্ডুল হতে বসেছে।

সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান জোর দিয়ে বলেন, জুলাই সনদ বাংলাদেশ-এর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও অনন্য দলিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গ—বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার সঠিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা। সংবিধান সংস্কার কমিটির প্রাথমিক প্রস্তাবনাগুলো যথেষ্ট বৈপ্লবিক ছিল, বিশেষ করে একই ব্যক্তি একই সঙ্গে সরকার প্রধান ও দলীয় প্রধান হতে পারবেন না। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল চাপের কারণে সেগুলোতে সমঝোতা করতে বাধ্য হতে হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

গণভোট ও সাংবিধানিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা

কনভেনশনের চূড়ান্ত সেশনে বক্তারা বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগ করা এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থা বজায় রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল ও গুম কমিশন গঠন থেকে পিছিয়ে আসা মূলত মূল সংস্কার প্রক্রিয়া না করারই সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। ক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে উপভোগ করার মানসিকতা থেকে বের হতে না পারলে দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরানো সম্ভব নয়।

রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে হলে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতির ভিত্তিতে সংসদ গঠিত হওয়া, নিরপেক্ষ বোর্ডের মাধ্যমে সাংবিধানিক পদে নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং স্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। যদি বর্তমান শাসকগোষ্ঠী গণভোট ও সাংবিধানিক রূপরেখা থেকে দূরে সরে যায়, তবে জনগণ আবারও নতুন সংবিধান ও কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।

#রাজনীতি #বাংলাদেশ #সংস্কার #গণভোট #সংবিধান