গৃহযুদ্ধের এক দশক পর সিরিয়া আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হিসেবে তার গুরুত্ব ফিরে পেতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে আসাদ সরকারের পতনের পর, দেশটি আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে গতি এনেছে। চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে ২৯৯টি ইরাকি জ্বালানি ট্যাংকারের একটি বহর সিরিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ করে ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর বানিয়াসের দিকে রওনা হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সীমিত পথগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। ২০০৩ সালের মার্কিন আগ্রাসনের পর এটিই প্রথমবার, যখন ইরাকি তেল বৈধভাবে সিরিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে উপকূলের দিকে গেল। এপ্রিলের শেষের দিকে ইরাক রাবিয়া সীমান্ত পারাপারটি পুনরায় চালু করে, যা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত ২ দশমিক ১ মিলিয়ন মেট্রিক টনেরও বেশি ইরাকি জ্বালানি সিরিয়ার উপকূলে স্থানান্তরিত হয়েছে। সিরিয়ার কাস্টমস এজেন্সির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টের মধ্যে ৩,২৭,০০০টি ট্রাক প্রায় সাত মিলিয়ন টন পণ্য নিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করেছে। জর্ডান, কাতার, সৌদি আরব এবং তুরস্ক দ্রুত দামেস্কের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে বাণিজ্য বাড়াতে শুরু করেছে। নতুন বাণিজ্যিক করিডর মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্যিক পথের বৈচিত্র্যায়ণের প্রয়োজন নতুন নয়। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় নতুন রুটগুলোর গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। চলতি বছরের এপ্রিল ও জুনে জর্ডান, সৌদি আরব, সিরিয়া এবং তুরস্ক আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে হিজাজ রেলওয়ে পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের মতো বিশ্লেষক সংস্থার মতে, এই রেললাইন চালু হলে বছরে ১৫ লাখ কনটেইনার পরিবহন সম্ভব হবে, যা বন্দর সম্প্রসারণের মাধ্যমে ৩০ লাখে উন্নীত করা যেতে পারে। প্রেসিডেন্ট শারা যে ‘চার সাগর ও নয় করিডর’ প্রকল্পের রূপরেখা দিয়েছেন, এই রেললাইন পুনর্নির্মাণ তারই অংশ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে পারস্য উপসাগর, কাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণসাগর এবং ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করে পণ্য, বিদ্যুৎ ও তেল পরিবহনের একটি বিশ্বমানের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চায় দামেস্ক। জুলাই মাসে ইরাক ও সিরিয়া ধ্বংসপ্রাপ্ত কিরকুক-বানিয়াস তেল পাইপলাইন সংস্কারে সম্মত হয়েছে। এর ফলে ইরাক তার তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি অংশ হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে পাঠাতে পারবে। বিনিয়োগ ও চ্যালেঞ্জ সিরিয়ার বর্তমান নেতৃত্ব মধ্যপ্রাচ্যের নতুন আঞ্চলিক সংকটকে নিজেদের অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের সুযোগ হিসেবে দেখছে। ফেব্রুয়ারির শেষে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের জন্যই ইরানি হামলার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে সবাই এখন সিরিয়ার কৌশলগত স্থল ও সমুদ্রপথের দিকে ঝুঁকছে। দামেস্ক এই বাণিজ্যিক আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে একটি নতুন রাজস্ব উৎস তৈরির চেষ্টা করছে। তবে বিনিয়োগের এই গতি ও মাত্রা সিরিয়ার দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাকে ছাপিয়ে যেতে পারে। বিনিয়োগের অনুমোদন, সরকারি জমির বণ্টন এবং করছাড়ের পূর্ণ ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থার হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। স্বাধীন কোনো তদারকি ব্যবস্থা না থাকায়, এই কেন্দ্রীকরণ আসাদ আমলের মতো রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার দুর্নীতিকে ফের উসকে দিতে পারে। সিরিয়াকে নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য পথ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় বাধা হতে পারে ইসরায়েল। হিজাজ রেলওয়ে পুনর্নির্মিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক করিডরে ইসরায়েলের গুরুত্ব অনেকটাই কমে যাবে। জুনে ইসরায়েলের পরিবহনমন্ত্রীও স্পষ্ট জানিয়েছেন যে ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়ে যেকোনো আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি করিডর তৈরি করা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। ইসরায়েল ২০২৫ সালে দোহায় হামাসের আস্তানায় হামলা চালায়, সিরিয়ার বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে বোমা বর্ষণ করে এবং দক্ষিণ সিরিয়ার কিছু এলাকা দখল করে নেয়।