নির্বাচনী মাঠে বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ: স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাব
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় শৃঙ্খলা ও মনোনয়ন বাস্তবায়ন নিয়ে চরম অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে বিএনপি। দেশের বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ও দলীয় নির্দেশ অমান্য করে অন্তত ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৭৯টি সংসদীয় আসনে এই বিদ্রোহী প্রার্থীরা সক্রিয় রয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ৩০ জন নেতা অত্যন্ত শক্তিশালী বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নিজস্ব সংগঠন ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখার কারণে এই বিদ্রোহী প্রার্থীরা এখন দলের মূল ও জোট প্রার্থীদের জন্য প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
রাজধানী ঢাকায় ত্রিমুখী লড়াই ও মাঠের চরম বাস্তবতা
রাজধানী ঢাকা-র ২০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত তিনটি আসনে দলের হেভিওয়েট বিদ্রোহী প্রার্থীরা ফুটবল প্রতীক নিয়ে সরাসরি মাঠে নেমেছেন। ঢাকা-৭ আসনে যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার স্বতন্ত্রভাবে লড়ছেন, যিনি স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। অন্যদিকে ঢাকা-১২ আসনে জোট শরিক দলকে সমর্থন জানানো হলেও মাঠ ছাড়েননি প্রভাবশালী নেতা সাইফুল আলম নীরব। এছাড়া ঢাকা-১৪ আসনে সাবেক সংসদ সদস্যের ছেলে সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক প্রার্থী হওয়ায় সেখানে নির্বাচনী লড়াই ত্রিমুখী রূপ নিয়েছে।
ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় বিদ্রোহীদের শক্তিশালী অবস্থান
ঢাকার বাইরে জেলাগুলোতেও একই ধরনের চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাগেরহাট, নোয়াখালী, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম এবং সুনামগঞ্জ সহ দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সাবেক সংসদ সদস্য ও বহিষ্কৃত প্রবীণ নেতারা ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। বাগেরহাট জেলার চারটি আসনের সবকটিতেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। কুমিল্লা-২ আসনে খালেদা জিয়ার সাবেক কর্মকর্তা আবদুল মতিন খান বহিষ্কারাদেশ উপেক্ষা করে মাঠে সক্রিয় আছেন। একইভাবে সাতক্ষীরা-৩ আসনে জনপ্রিয় চিকিৎসক ডা. শহীদুল আলম বিদ্রোহী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ভোট কাটাকাটির গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মিত্র জোটে অস্বস্তি ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদী চাপ
যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও মিত্র দলগুলোর মনোনীত প্রার্থীরাও মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরের বিপক্ষে বিএনপি-র হাসান মামুন মাঠে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। অপরদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে শরিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এবং যশোর-৫ আসনে স্থানীয় হেভিওয়েট নেতারা জোটের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়ছেন। কেন্দ্র থেকে একাধিক বহিষ্কারাদেশ জারি করা সত্ত্বেও তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “একই ভোটব্যাংকে ধানের শীষ ও বিদ্রোহী—দুই পক্ষই নির্ভরশীল হওয়ায় বহু আসনে ভোট দুই বা তিন ভাগে বিভক্ত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে।” এর ফলে নিশ্চিত জয়ের আসনগুলোতেও মিত্র ও দলীয় প্রার্থীদের ভরাডুবি হতে পারে। তবে দলের শীর্ষ নেতারা দাবি করছেন যে, প্রার্থীরা নয় বরং রাজনৈতিক প্রতীক ও নীতিই মূল বিবেচ্য বিষয়। তা সত্ত্বেও প্রায় ৪০টি আসনে বিদ্রোহীদের শক্ত অবস্থান ভবিষ্যতে দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম সিদ্ধান্তহীনতা ও দীর্ঘমেয়াদী চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
#রাজনীতি #নির্বাচন #বাংলাদেশ #সংবাদ