জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্র সংস্কার: এনসিপির অবস্থান
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জুলাই স্মৃতি হলে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এক গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী বক্তব্য প্রদান করেছেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে, ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা এবং সামগ্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক দায়িত্ব একমাত্র এনসিপি-কেই কাঁধে তুলে নিতে হবে। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, দেশের বহু রাজনৈতিক দল নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে বড় বড় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তীতে তাদের অবস্থান ও নীতিগত জায়গা থেকে সরে এসেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তরুণ প্রজন্মের ঐক্য ও বিচার নিশ্চিতকরণের দাবি
নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে স্পষ্ট ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ-এর গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন এবং জুলাই গণহত্যার সুনির্দিষ্ট বিচার কার্যকর করার ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা কেবল তাদের দলের ওপরই বর্তায়। এই মহান লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি দেশের উদীয়মান তরুণ প্রজন্ম এবং ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী সর্বস্তরের জনগণকে জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য আকুল আহ্বান জানান।
তিনি প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নির্বাচনের উদাহরণ তুলে ধরে সতর্কবার্তা দেন। সেখানে সংখ্যালঘু মুসলিম ও মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার হরণ এবং নানাবিধ নির্যাতনের অভিযোগের আঁচ বাংলাদেশেও এসে পড়তে পারে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। এই প্রেক্ষাপটে তিনি ঘোষণা দেন যে, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক পরিসরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, মানবিক ও সুসংহত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে গড়ে তুলতে হবে। তিনি দেশের সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা এবং সুনির্দিষ্ট নাগরিক অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি যেকোনো ধরনের অনভিপ্রেত “সাম্প্রদায়িক উসকানি ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে” বলে উদাত্ত আহ্বান জানান।
নারী নেতৃত্ব, স্বাস্থ্য খাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা
ঐতিহাসিক আন্দোলন-সংগ্রামে নারীদের অগ্রণী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি অত্যন্ত আত্মসমালোচনার সুর তুলে ধরেন। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে বন্দরনগরীর হাজার হাজার অদম্য নারী রাজপথে নেমে এসে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে আন্দোলন পরবর্তীতে তাদের দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত রাখতে না পারাটা দলের একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ব্যর্থতা বলে তিনি স্বকীয় সততার সাথে স্বীকার করে নেন। আগামী দিনে নারীদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ, সহনশীল ও সম্মানজনক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাতের সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ
বর্তমান সময়ে সমগ্র দেশজুড়ে আশঙ্কাজনকভাবে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া এবং ক্রমাগত শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তিনি তীব্র গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যর্থতার জন্য শুধু পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের ওপর ঢালাও দোষ চাপিয়ে নিজেদের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও জনগণের কাছে প্রতিটি কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে। দেশের শিশুদের যথাযথ সুচিকিৎসা এবং হাসপাতালগুলোতে জরুরি আইসিইউ সুবিধা অবিলম্বে সুনিশ্চিত করার প্রবল দাবি জানান তিনি।
দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সংহতি বজায় রাখার ওপর তাগিদ দিয়ে নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট জানান, সুদৃঢ় ঐক্যই হলো তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি। অভ্যন্তরীণ প্রতিটি বিরোধ ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। বক্তব্যের সমাপ্তিতে তিনি বিপ্লবের পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের মহান সংগ্রামের ঐতিহাসিক স্মৃতি স্মরণ করেন। মাস্টারদা সূর্যসেনের ঐতিহাসিক বিপ্লব থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত এই বীরত্বপূর্ণ অঞ্চলের আপসহীন রক্তক্ষয়ী ইতিহাস রয়েছে। সেই অনন্য বৈপ্লবিক চেতনাকে বুকে ধারণ করেই সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও শক্তিশালী ও সংহত করার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
#রাজনীতি #বাংলাদেশ #এনসিপি #সংবাদ #চট্টগ্রাম