শাপলা চত্বরের স্মরণে ন্যায়বিচারের সংগ্রাম অব্যাহত রাখার ঘোষণা
২০১৩ সালের ৫ মে ইতিহাসের এক অত্যন্ত ভয়াল ও বেদনাবিধুর দিন হিসেবে চিহ্নিত। রাজধানী ঢাকা-র মতিঝিল-এর শাপলা চত্বর-এ ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত ন্যায়বিচারের আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-এর আমির এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক বিশেষ স্ট্যাটাসে তিনি এই কথা ব্যক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ২০১৩ সালের এই ঐতিহাসিক দিনে একটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন চরম নির্মম দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিল এবং সেদিন অসংখ্য নিরীহ ও সাধারণ মানুষের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল শাপলা চত্বর।
ইতিহাসের করুণ অধ্যায় ও রক্তঝরা রাতের স্মৃতি
ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত অনুভূতি তুলে ধরে তিনি লেখেন, “সে রাতের ভয়াবহ ও মর্মান্তিক স্মৃতি এখনও সমগ্র জাতির হৃদয়ে এক গভীর ও দগদগে ক্ষত হয়ে আছে এবং ইতিহাসের এই অধ্যায় কখনো ভুলে যাওয়ার নয়।” বরং এটি প্রতি মুহূর্তে পুরো জাতিকে তাদের নৈতিক দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি আরও বলেন, ৫ মে তিনি নিজে গাবতলী পয়েন্টে দায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরবর্তীতে শাপলা চত্বরে বিশাল জমায়েতের ঘোষণা আসার পর সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে মিছিল নিয়ে তিনি শাপলা চত্বরের অভিমুখে ধাবিত হন। ঢাকা অবরোধের প্রতিটি প্রবেশ পথ থেকে লাখ লাখ মানুষের মহাসমুদ্র এসে মিলিত হতে থাকে শাপলার মোহনায়। সাধারণ মানুষের এই অনিঃশেষ ও বাঁধভাঙা যাত্রা দেখে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী শাসকচক্র চরম দিশেহারা হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে হিংস্র পশুর মতো তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে অহিংস ও নিরীহ জনতার ওপর। মুহূর্তের মধ্যে তাজা রক্তের বন্যায় ভেসে যায় গুলিস্তান, জিরো পয়েন্ট, প্রেসক্লাব, পল্টন, দৈনিক বাংলা ও বিজয়নগর-সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল। মৃত্যুর ভয় অতিক্রম করে জীবনের চূড়ান্ত ঝুঁকি নিয়ে মানুষ শাপলা চত্বরের দিকে ছুটে যায়। সন্ধ্যার রক্তিম পশ্চিম আকাশের আলো একাকার হয়ে যায় ঢাকার রাজপথের তাজা রক্তের সঙ্গে। পরবর্তীতে একের পর এক তাজা লাশ মঞ্চের দিকে আসতে থাকলে শাহাদাতের তামান্না সবার শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে। গভীর রাত দুইটার পর হঠাৎ করে সমগ্র এলাকায় ব্ল্যাকআউট করা হয় এবং চতুর্দিক থেকে শুরু হয় মুহুর্মুহু বর্বরোচিত হামলা। অস্ত্রের মুখে সেদিন নিরুপায় ও অসহায় হয়ে পড়ে আপামর জনতা।
সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ ও জাতীয় স্বীকৃতি
দীর্ঘদিন ধরে এই মর্মান্তিক ঘটনার শহীদের তালিকা তৈরি ও নথিপত্র সংরক্ষণ করা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সম্ভব হয়নি। তবে ২৪ পরবর্তী সময়ে নতুন উদ্যমে এই সংগ্রাহিক কাজ শুরু করা হয়েছে। বর্তমানে শাপলা স্মৃতি সংসদের মাধ্যমে শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং নথিপত্র সংরক্ষণের সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে হেফাজতে ইসলাম ছাড়াও খেলাফত ছাত্র মজলিস, যুব মজলিস, ছাত্র শিবির, ছাত্র জমিয়ত, ইনকিলাব মঞ্চ, ডাকসু, চাকসু, রাকসু ও এনসিপি-সহ বহু রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন শাপলা চত্বরের স্মৃতিকে ধারণ করে বিভিন্ন স্মারক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা বহন করে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, জাতীয় স্বীকৃতি ও চূড়ান্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের সার্বিক দায় পূর্ণ হবে না। শহীদদের রক্তের সঠিক মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার পবিত্র নৈতিক দায়িত্ব। সত্য প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচারের জন্য আমাদের আন্দোলন অবিরাম চলবে এবং যতদিন না বিচার সম্পন্ন হচ্ছে, ততদিন এই দাবি কোনোভাবেই থামবে না।
#শাপলা_চত্বর #রাজনীতি #বাংলাদেশ #সংবাদ #ন্যায়বিচার