নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায় শুধু নতুন ডিজিটাল আইন প্রণয়ন বা পুরোনো আইন সংশোধন করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য বর্তমানে একটি বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।

আজ রোববার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ডিজিটাল পলিসিস অ্যান্ড রাইটস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। বেসরকারি সংস্থা টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউট এই আলোচনার আয়োজন করে। বৈঠকে ডিজিটাল নীতি, সাইবার আইন, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারি নিয়ে আলোচনা হয়।

আইনের অপপ্রয়োগ ও প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি

বৈঠকে দ্য ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ ডিজিটাল অধিকার রক্ষায় নতুন আইনের চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হিসেবে বিদ্যমান আইনের অপপ্রয়োগ কীভাবে বন্ধ করা যায়, সেদিকে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, শুধু আইন থাকলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, বরং আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করা যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভূমিকা প্রসঙ্গে কামাল আহমেদ মন্তব্য করেন যে, প্ল্যাটফর্ম-সংক্রান্ত সরকারের সামগ্রিক নীতি এখনো যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। ক্ষতিকর কনটেন্ট সরাতে প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও, তা সময়মতো কার্যকর না হলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তাঁর মতে, প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘিত হলে তাদের সরকারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের কাছেও দায়বদ্ধ থাকতে হবে।

আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সংকট

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশের আইন প্রণয়ন ও ডিজিটাল জবাবদিহির সংকটকে মূলত তিনটি পক্ষের ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত করেন। এই পক্ষগুলো হলো আমলাতন্ত্র, রাজনীতিবিদ এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমলাতন্ত্র আইনের প্রাথমিক খসড়া তৈরিতে ভূমিকা রাখলেও, বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র কার্যত পুরো আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগসাজশে এই নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইফতেখারুজ্জামান মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের দায়িত্ব যদি সম্পূর্ণভাবে কমিশনের আওতাবহির্ভূত রাখা হয় এবং প্রতিকারের ব্যবস্থাও যদি সেই একই ক্ষমতাকাঠামোর নিয়ন্ত্রণে থাকে, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাহলে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অংশগ্রহণমূলক নীতিনির্ধারণের গুরুত্ব

সমাপনী বক্তব্যে টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের কান্ট্রি হেড ফৌজিয়া আফরোজ আইন ও নীতি প্রণয়নের পরামর্শ প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজ, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মতামত অন্তর্ভুক্ত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকারকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষগুলোর মতামত শুনলেই হবে না, বরং সমাজের বিভিন্ন অংশের কথাও শুনতে হবে। একই সঙ্গে, অংশগ্রহণমূলক নীতিনির্ধারণের পথ তৈরি করা অপরিহার্য।

বৈঠকে টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে একটি উপস্থাপনাও দেওয়া হয়। এই উপস্থাপনায় সাইবার সুরক্ষা আইন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন এবং জাতীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা আইনসহ গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আইন ও নীতির বিভিন্ন দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়। গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিজওয়ানুল ইসলাম, বিটিআরসির উপপরিচালক এস এম তাইফুর রহমান, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির পরিচালক হোসাইন বিন আমিন, আইনজীবী প্রিয়া আহসান চৌধুরী এবং কার্টুনিস্ট মেহেদী হকসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।