জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকরের দাবিতে জাতীয় কনভেনশন
ঢাকা-র ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তনে জ্বালানি, অর্থনীতি, শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ও গণভোটের যৌক্তিকতা বিষয়ে এক জাতীয় কনভেনশন অত্যন্ত সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি কর্তৃক আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রশাসনিক অবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা প্রসঙ্গে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশে টেকসই গণতান্ত্রিক পরিবেশ সুনিশ্চিত করা এবং নতুন করে কোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পুনরুত্থান সম্পূর্ণভাবে রোধ করতে হলে অবিলম্বে বাতিল হওয়া জরুরি অধ্যাদেশগুলো পুনর্বহাল করা অত্যন্ত আবশ্যক।
সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সুসংগঠিত উদ্যোগ এবং সমন্বিত জোরালো পদক্ষেপের মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে ভেতর ও বাইরে থেকে কার্যকর রাজসংক্রান্ত চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যদি জুলাই সনদ অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত ও প্রস্তাবিত সংস্কারসমূহ সময়মতো বাস্তবায়িত না হয়, তবে পুরো দেশ আবারও এক ভয়াবহ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অন্ধ গলিতে ফিরে যেতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠিত হওয়ার প্রত্যক্ষ ও আশঙ্কাজনক ঝুঁকি তৈরি হবে, যা পুরো জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ ও চলমান গণতান্ত্রিক সংকট
দিলারা চৌধুরী তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বছরের পর বছর ধরে চলা অনুচিত রাজনৈতিক প্রভাব ও বিষাক্ত দলীয়করণের ফলে দেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জনগণের সেবাদানের মৌলিক সংবিধানিক দায়িত্ব থেকে বহুদূরে সরে গিয়েছিল। নির্বাচন কমিশনসহ নানা স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানকে শুধুমাত্র অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার হিংসাত্মক হাতিয়ার হিসেবে নির্দ্বিধায় ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তি চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। ২০২৪-পরবর্তী সময়ে নানামুখী অর্থবহ সংস্কারের মধ্য দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে ফিরিয়ে আনার যে নতুন আশা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকারের কিছু সাম্প্রতিক বিভ্রান্তিকর পদক্ষেপে তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এই প্রবীণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরও বলেন, “নির্বাচনের মাত্র দুই মাসের মাথায় জুলাই সনদ ও বিভিন্ন অধ্যাদেশে প্রস্তাবিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো কৌশলে বাতিল বা চরম উপেক্ষা করা হচ্ছে।” জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো স্বাধীন সংস্থাবুলোর সংস্কার প্রস্তাব বর্তমানে কার্যত ধ্বংসের পথে ধাবিত হচ্ছে।
বিচার বিভাগের সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতার কার্যকর ভারসাম্য
বক্তব্যে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের অহেতুক হস্তক্ষেপের আশঙ্কাজনক সম্ভাবনাকে দেশের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন করার সুস্পষ্ট প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও, সেই ক্ষমতাকে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর একক নিয়ন্ত্রণে রাখার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এতে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণভাবে নির্বাহীর রাজনৈতিক প্রভাবাধীন হয়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অতীতে যেভাবে বিচারালয়কে ব্যবহার করে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগ উঠেছিল, ঠিক তেমনই এক কলঙ্কজনক পরিস্থিতি পুনরায় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এর ফলে নিরপেক্ষ জুডিসিয়ারি তার নিজস্ব স্বাধীনতা হারাবে।
এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, রাষ্ট্রপতি এবং প্রবীণ জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের সুপারিশ করেন। এছাড়া অতিরিক্ত নির্বাহী ক্ষমতা যাতে ভবিষ্যতে কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য রাষ্ট্র পরিচালনায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।
#রাজনীতি #বাংলাদেশ #সংবাদ #সংস্কার #গণতন্ত্র