ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্যান্য ইরানি নেতা নিহত হন। এই অভিযান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের একটি লক্ষ্য পূরণ করলেও, এই যুদ্ধে জড়িয়ে ওয়াশিংটন এখন এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি, এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাথমিক দাবি যে ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছে, তা এখন মিথ্যা বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। নেতানিয়াহু হয়তো আশা করেছিলেন যে তেহরানে সরকারের পতন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার একটি বড় হাতিয়ার হবে। অন্যদিকে, ছয় মাসের যুদ্ধের প্রভাব ইরানের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে তেমন কোনো কাজে আসেনি, যা এখন ইরান সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের মূল সমালোচনা ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানি তেলের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। ট্রাম্পের দাবি সত্ত্বেও, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির বেহাল দশা কাটাতে এই দাবিগুলো তেমন কোনো কাজে আসছে না। অনেক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন রেকর্ড পরিমাণ তলানিতে ঠেকেছে। তাঁর দেশীয় কর্মকাণ্ডের ব্যর্থতার পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতিরও কড়া সমালোচনা হচ্ছে। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শিবলী তেলহামি উল্লেখ করেন, যুদ্ধের কারণে বেড়ে যাওয়া আর্থিক ব্যয় এখন প্রধান একটি সমস্যা। নেতানিয়াহুর প্ররোচণায় ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এই অজনপ্রিয় যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন বলে সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইপসোসের এক জরিপ অনুযায়ী, প্রতি তিনজনে একজনেরও কম আমেরিকান এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন। তেলহামি আরও বলেন, ইসরায়েল ইস্যুটি এখন মানুষের পকেটে টান পড়া এবং মূল মূল্যবোধের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে যায় এমন একটি চুক্তিতে রাজি হতে ইরান সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্প গত সপ্তাহে তেহরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘ইকোনমিক ডি-ডে’। আমেরিকান লেখক ও কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলছেন, ইরানের অর্থনীতির ওপর যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব সত্ত্বেও, তেহরানের সরকার এখনো টিকে আছে। মিলার আল–জাজিরাকে বলেন, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনো ওই দেশে রয়ে গেছে এবং তারা চাইলে এটি আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। ইরান তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যার ফলে তারা হরমুজ প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। মিলার আরও উল্লেখ করেন, হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সহযোগী শক্তিগুলো দুর্বল হলেও, তারা এখনো টিকে আছে। এই সামরিক অভিযানের ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ইসরায়েলের ব্যর্থতা লন্ডনের কিংস কলেজের সিনিয়র টিচিং ফেলো আহরন ব্রেগম্যান বলেন, গাজা ও লেবাননের পর এখন ইরানেও নেতানিয়াহুকে ব্যর্থ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক ইসরায়েলিই নেতানিয়াহুর ইরান যুদ্ধকে একটি মারাত্মক নিরাপত্তাজনিত ভুল বলে মনে করছে। ব্রেগম্যান বলেন, নেতানিয়াহু জনমত জরিপে পিছিয়ে পড়ছেন এবং এর যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে আটকানোর দিকে নজর না দিয়ে, তিনি তেহরানের সরকার পতনের দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন এবং ট্রাম্পকেও তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে রাজি করিয়েছিলেন। এর সবই ব্যর্থ হয়েছে এবং ইরান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বোমা তৈরির অনেক বেশি কাছাকাছি চলে এসেছে। গত জুনে ইসরায়েলের অংশগ্রহণ ছাড়াই ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার মার্কিন সিদ্ধান্তটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করার একাধিক সুযোগ এনে দিয়েছে। ইসরায়েল সরকারের সাবেক উপদেষ্টা দানিয়েল লেভি বলেন, যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়েনি। তাই এটি তাঁকে নির্বাচনের জন্য কাঙ্ক্ষিত সুবিধা এনে দিতে পারেনি।