অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে রাজস্ব আহরণে অটোমেশন ও দুর্নীতি প্রতিরোধের তাগিদ

ঢাকা-র কাকরাইলে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কনভেনশনে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, জাতীয় খাতের বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগণ জাতীয় অর্থনীতি পুনর্গঠনে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন। বক্তারা স্পষ্টভাবে বলেন যে, দেশে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া শিক্ষিত বেকার সমস্যা দূরীকরণে নতুন আঙ্গিকে উদ্ভাবনী নীতি প্রণয়ন করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তারা উল্লেখ করেন, রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া সুসংহতকরণে সর্বাত্মক অটোমেশন চালু করা এবং বিভিন্ন বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সব ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম অবিলম্বে বন্ধ করতে পারলে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটানো সম্ভব হবে। কনভেনশনে দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে বিশদ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান

কনভেনশনের উন্মুক্ত আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্যাশলেস, পেপারলেস ও ডিজিটাল এনআইডি অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে কর ও শুল্ক নীতি সম্পূর্ণ অটোমেশন করা এখন অত্যন্ত অপরিহার্য। বর্তমানে দেশে প্রায় কোটিটির বেশি টিআইএনধারী নাগরিক ও নিবন্ধনকৃত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলেও, মাত্র অল্প সংখ্যক মানুষ নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। আয়কর প্রদান পদ্ধতির জটিলতা ও সনাতনী ধারের কারণেই রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এমন বিশাল ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে কর রিটার্ন ব্যবসাকে ইন্টিগ্রেটেড করা গেলে অসাধু উপায়ে লেনদেনের প্রবণতা ও টেবিলের নিচে ঘুষ আদান-প্রদান প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে বিজ্ঞ বক্তাগণ মত প্রকাশ করেন।

একই সাথে দেশের বর্তমান গভীর জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য আমদানিনির্ভরতা থেকে দ্রুত বের হয়ে আসার তাগিদ দেওয়া হয়। “কেবলমাত্র নবায়নযোগ্য ও বৈচিত্র্যময় জ্বালানি খাতের বিকাশই দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করতে সক্ষম।” আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধের প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত রাখতে দ্রুত টেকসই জ্বালানি নীতিতে রূপান্তরের বিকল্প নেই বলে সভায় সতর্ক করা হয়।

যুব বেকারত্ব নিরসন, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও মেগা প্রকল্পের দুর্নীতি প্রতিরোধ

দেশে বর্তমানে বেকারত্বকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং মারাত্মক সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বক্তারা তথ্যে উল্লেখ করেন, সার্বিক জাতীয় বেকারত্বের হারের তুলনায় ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি। বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর বের হওয়া লাখ লাখ শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি উপযুক্ত কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকছেন। মানসম্মত শিক্ষা ও শিল্প খাতের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে কাজের সুযোগ তৈরির জোরালো আহ্বান জানানো হয়।

ব্যাংকিং সংস্কার, বেসরকারি ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি ও টেকসই পরিবর্তনের রূপরেখা

দেশের ব্যাংকিং খাত ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিনের সুশাসনের চরম অভাবকে বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রজেক্ট সহ বিগত আমলের বিভিন্ন বৃহৎ মেগা প্রকল্পের নামে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে আলোচনায় দাবি করা হয়। এছাড়া ক্যাপাসিটি চার্জের নামে প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিদেশি সংস্থাকে প্রদানের মাধ্যমে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করা হয়।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ অব্যাহত রাখতে সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া বন্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে অধিকাংশ ঋণ গ্রহণ করে, তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ থেকে বঞ্চিত হবেন, যা শেষ পর্যন্ত নতুন চাকরি তৈরিতে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। সভায় রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টি-র নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনরা দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতির কথা ব্যক্ত করেন।

#অর্থনীতি #বাংলাদেশ #বেকারত্ব #সংস্কার #সুশাসন