বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)-এর চেয়ারম্যান পদে নতুন নিয়োগে সরকার এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বিদায়ী চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের দুই সপ্তাহ পরও নতুন প্রধান নির্ধারণ সম্ভব হয়নি। প্রশাসন ও পিএসসি-ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, ‘সাবেক অভিজ্ঞ আমলা নাকি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাবিদ’—এই দ্বিমুখী দ্বন্দ্বের কারণেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি অংশের অভিমত হলো, সিভিল সার্ভিসের প্রশাসনিক কাঠামো ও বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের দায়িত্বের স্বরূপ একজন সাবেক আমলাই সবচেয়ে ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারেন। অন্যদিকে, পিএসসি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছেন যে অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে প্রশাসনিক সংস্কার ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদারে একজন যোগ্য শিক্ষাবিদের ভূমিকা কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর কার্যকালে পরীক্ষা-জট নিরসন, দ্রুত বিসিএস ফল প্রকাশ, ‘এক বছরে এক বিসিএস’ রোডম্যাপ বাস্তবায়ন, লিখিত পরীক্ষায় সার্কুলার ইভালুয়েশন ও ভাইভায় দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন শুরু করার মাধ্যমে অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। তবে প্রিলিমিনারির প্রশ্নে বানান ভুল নিয়েও সমালোচনা হয়েছিল।
সাংবিধানিক কাঠামো ও নিয়োগপ্রক্রিয়া
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৩৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পিএসসি একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা। এই কমিশনের চেয়ারম্যান ও অন্য সদস্যদের নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে সংবিধানের ১৩৮(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে। আইনি বিধি অনুসারে, রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে পিএসসির চেয়ারম্যানকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন।
নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্য এই নিয়োগটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব। নিয়োগপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে রাষ্ট্রপতি দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব মো. আবু আউয়াল জানান, প্রথা অনুযায়ী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে যাচাই-বাছাইয়ের পর তালিকাটি রাষ্ট্রপতির দপ্তরে প্রেরণের বিধান রয়েছে।
একান্ত সচিব স্পষ্ট করেন, ‘পিএসসির চেয়ারম্যান একটি সাংবিধানিক পদ। এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কোনো সুপারিশ বা তালিকা রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পৌঁছায়নি। প্রস্তাব পেলেই সংবিধান ও আইন অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েন ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার সংকট
অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের নেপথ্যে প্রকাশ্যে অসুস্থতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হলেও, আমলাতন্ত্রের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েন ভূমিকা রেখেছে বলে জানা গেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি পিএসসির পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে সোচ্চার ছিলেন।
পিএসসির এই নেতৃত্বের শূন্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ‘পিএসসি চেয়ারম্যানের পরিবর্তনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার সংকট। বারবার নেতৃত্ব বদল হলে পরীক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় বড় ধাক্কা লাগে।’
এই অধ্যাপক আরও জোর দিয়ে বলেন, ‘নতুন প্রধান নির্বাচনের ক্ষেত্রে “আমলা নাকি শিক্ষক”—এই পরিচয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর স্বাধীন চিন্তাশক্তি, নৈতিক দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। তাঁকে সব ধরনের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক নেটওয়ার্কের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। পিএসসির কাজ শুধু পরীক্ষা নেওয়া নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রশাসনের মূল দ্বার রক্ষা করা। তাই নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও সর্বজনগ্রাহ্য।’
বর্তমানে পিএসসির সাময়িক দায়িত্বে থাকা জ্যেষ্ঠ সদস্য নাজমুল আমীন মজুমদারের পরিচালনায় ৫০তম বিসিএসের ভাইভাসহ রুটিন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আগামী ২৫ নভেম্বরের মধ্যে এই বিসিএসের ফল প্রকাশের প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে। চাকরিপ্রার্থীরা মেধাভিত্তিক সিভিল সার্ভিস গঠন এবং ‘এক বছরে এক বিসিএস’ রোডম্যাপের মতো সংস্কারগুলোর গতি ধরে রাখতে অবিলম্বে একজন নিরপেক্ষ ও দক্ষ স্থায়ী চেয়ারম্যান নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।