শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ট্রাস্টে উপতত্ত্বাবধায়ক পদে নিয়োগে অনিয়ম এবং পরবর্তীতে উপতত্ত্বাবধায়ক আবদুল হাকিমের স্ত্রীসহ ছয় স্বজনকে বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের নির্দেশে কোনো প্রকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা বা নিয়োগ বোর্ড ছাড়াই আবদুল হাকিমকে উপতত্ত্বাবধায়ক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, আবদুল হাকিমকে ২০২০ সালের ৭ জুন উপতত্ত্বাবধায়ক পদে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়, যার অফিস আদেশে তৎকালীন মন্ত্রীর নির্দেশের কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর উপতত্ত্বাবধায়ক পদে নিয়োগ পান। নিয়োগের পর তিনি ঢাকা ও লালমনিরহাটে দায়িত্ব পালন করেন। চলতি বছরের মে মাসে তিনি আবার ঢাকায় বদলি হন। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন, যার প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ

আল-নাহিয়ান ট্রাস্টের চাকরির প্রবিধানমালা-২০০৬ অনুযায়ী, সরাসরি নিয়োগে উন্মুক্ত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পদ পূরণ করতে হবে এবং ট্রাস্টি বোর্ডের নিযুক্ত বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগদান করা হবে। উপতত্ত্বাবধায়ক পদে প্রার্থীকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। তবে আবদুল হাকিমের নিয়োগে এসব বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ে মাস্টার্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

ট্রাস্টের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক কে বি এম ওমর ফারুক চৌধুরী জানিয়েছেন, তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও নির্দেশে তিনি ওই নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি আবদুল হাকিমের নিয়োগকে পুরোপুরি অবৈধ উল্লেখ করে বলেন, কোনো প্রকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ বোর্ড গঠন এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে আল-নাহিয়ান ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক পদে থাকা যুগ্ম সচিব সামসুন নাহারও বলেছেন, উপতত্ত্বাবধায়ক পদে আবদুল হাকিমের নিয়োগ সঠিক হয়নি।

স্বজনদের নিয়োগ ও তদন্ত

চলতি বছরের মে মাসে উপতত্ত্বাবধায়ক আবদুল হাকিমের প্রভাবে তাঁর স্ত্রীসহ ছয় স্বজন আল-নাহিয়ান ট্রাস্টের বিভিন্ন পদে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আবদুল হাকিমের স্ত্রী সুমি আক্তার সহকারী শিক্ষক, ছোট ভাই হারুন অর রশীদের স্ত্রী শারমিন আক্তার ‘শিশুমাতা’ (মিরপুর), চাচাতো ভাই আশরাফুল ইসলাম বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি (মিরপুর), বড় ভাই আবদুল মোতালেবের স্ত্রী মঞ্জিলা বেগম শিশুমাতা (খণ্ডকালীন), মামাতো বোন সামিনা খাতুন ও খালাতো বোন রাশেদা খাতুন শিক্ষক (লালমনিরহাট) পদে নিয়োগ পেয়েছেন।

আল-নাহিয়ান ট্রাস্টে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে গত ৪ জুলাই লালমনিরহাট সদরের মহেন্দ্র নগরের বাসিন্দা রাসেল হক সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। রাসেল হক অভিযোগ করেছেন যে কোনো রকম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই উপতত্ত্বাবধায়ক আবদুল হাকিমের আত্মীয়স্বজনসহ অনেককে বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক গত ২২ জুলাই তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের কথা বলা হলেও, নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা পড়েনি। জেলা প্রশাসক আশা করছেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হবে।

শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ট্রাস্ট ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত। এর প্রধান কার্যালয় রাজধানীর বনানীতে।