বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তীব্র ভাঙন: কোটি টাকা লুটপাটের গুরুতর অভিযোগ

গত বছরের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বড় ধরনের চরম সংকট ও তীব্র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। সংগঠনের নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে ওঠায় কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে পাঁচ সদস্যের এক অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনের শীর্ষ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাত ও লুটপাটের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদ্য সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদ ও দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেনসহ কয়েকজন শীর্ষ সারির সমন্বয়ক নতুন গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-তে যোগ দেওয়ার পরপরই সংগঠনটিতে এই অভূতপূর্ব অস্থিতিশীল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।

জরুরি বৈঠকে কেন্দ্রীয় কমিটি স্থগিত ও তীব্র প্রতিক্রিয়া

সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত মেয়াদের আগেই দায়িত্বশীল নেতাদের দল ত্যাগ করে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যোগ দেওয়ার ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়। এমন অবস্থায় বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রানিং কমিটি স্থগিত ঘোষণা করা হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা পরিষদ পরবর্তী সমস্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম ও দিকনির্দেশনা সম্পন্ন করবে। তবে সংগঠনের একটি বড় অংশ এই একতরফা সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে এর তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের দাবি, কোনো নিয়মকানুন না মেনে অগণতান্ত্রিকভাবে কমিটি বিলুপ্ত করার আইনগত অধিকার কারও নেই।

আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও মুখ বন্ধ রাখার অভিযোগ

সংগঠনটির অরাজনৈতিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক আর্থিক অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশা অভিযোগ করে বলেন, “সংগঠনের তহবিল থেকে প্রায় এক কোটি টাকার ওপর বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।” তিনি দাবি করেন, এই বড় অংকের আর্থিক অনিয়ম গোপন রাখা এবং দায় এড়ানোর উদ্দেশ্যেই শীর্ষ নেতারা তড়িঘড়ি করে রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন। তিনি আরও জানান, অর্থিক অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন তোলায় ও জবাবদিহিতা চাওয়ায় তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও অন্যান্য অফিশিয়াল যোগাযোগ মাধ্যম থেকে রিমুভ করে দেওয়া হয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন জেলার ইউনিটগুলোর সাথে সার্বিক যোগাযোগ বজায় রেখে বিস্তারিত প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে সত্য উন্মোচন করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

নেতৃবৃন্দের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া ও আগামী দিনের শঙ্কা

অন্যদিকে, অভিযুক্ত নেতারা সব ধরনের আর্থিক অনিয়মের দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মুঈনুল ইসলাম জানান, “সংগঠনে কোনো প্রকার অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রশ্নই আসে না, ব্যক্তিস্বার্থে কেউ কোনো অনিয়ম করেনি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে গঠনতন্ত্র প্রণয়ন না করা এবং সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক রাজনৈতিক দলে চলে যাওয়ায় অথরাইজেশনের অভাবে অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী কমিটি অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এদিকে, সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আন্দোলনকে পকেট কমিটির মাধ্যমে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে এই ধরনের নব্য স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঐতিহাসিক আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও রূপরেখা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

#বৈষম্যবিরোধী_ছাত্র_আন্দোলন #বাংলাদেশ #রাজনীতি #ছাত্র_আন্দোলন