১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে পোল্যান্ডের ডানজিগ বন্দরের কাছে ওয়েস্টারপ্লাটে জার্মান সেনাদের আক্রমণের মধ্য দিয়ে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। হিটলারের নির্দেশে জার্মানি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন মাত্রার যুদ্ধ শুরু করে। এর প্রস্তুতি হিসেবে, ২৪ আগস্ট ১৯৩৯ তারিখে জার্মান যুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ জাহাজ ‘শ্লিসভিগ-হোলস্টাইন’ যাত্রা শুরু করে। সরকারি উদ্দেশ্য ছিল ডানজিগের মুক্ত নগরীতে বন্ধুত্বপূর্ণ সফর, কিন্তু এর অন্তরালে ছিল গোপন সামরিক পরিকল্পনা। জাহাজটির অধিনায়ক গুস্তাভ ক্লাইকাম্পকে পোল্যান্ড আক্রমণের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল।

ডানজিগ: আক্রমণের অজুহাত

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান-অধ্যুষিত ডানজিগকে জাতিপুঞ্জ সুরক্ষার অধীন একটি মুক্ত নগররাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। হিটলারের জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের কাছে ডানজিগের এই রাজনৈতিক অবস্থান বিরক্তিকর ছিল। প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস-এর প্রচারণায় ডানজিগকে ‘জার্মান রাইখে ফিরিয়ে আনার’ দাবি তোলা হয়। তবে অ্যাডলফ হিটলার ২৩ মে ১৯৩৯-এ উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, ডানজিগ দখল মূল বিষয় নয়, বরং পূর্ব দিকে জীবনধারণের জন্য আরও সম্প্রসারিত জার্মান ভূখণ্ডই ছিল আসল লক্ষ্য। ১ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে ওয়েস্টারপ্লাটে আক্রমণ শুরু হয়, যেখানে পোলিশ সেনাবাহিনীর প্রায় ২১৮ জন সৈন্য একটি সুরক্ষিত গোলাবারুদ গুদাম পাহারা দিচ্ছিলেন। যুদ্ধজাহাজ ‘শ্লিসভিগ-হোলস্টাইন’ থেকে ছোড়া গুলিকেই আজও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাকারী গুলি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

হিটলারের ভাষণ ও জনমত

১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ তারিখে বার্লিনের রাইখস্টাগে দেওয়া ভাষণে ফ্যুরার ও রাইখ চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলার পোল্যান্ডে আক্রমণের পক্ষে নিজের যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি জার্মান জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে জার্মানি একটি ন্যায়সংগত প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ করছে।

আমি নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাই না। আমি আমার বিমানবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি, তারা যেন আক্রমণের সময় নিজেদের কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে। কিন্তু যদি শত্রুপক্ষ মনে করে যে এর মাধ্যমে তারাও একই ধরনের পদ্ধতিতে যুদ্ধ করার অবাধ অনুমতি পেয়েছে, তাহলে তারা এমন জবাব পাবে যে তাদের চোখ-কান ধাঁধিয়ে যাবে! আজ রাতে পোল্যান্ড প্রথমবার আমাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে নিয়মিত সৈন্যদের দিয়েও গুলি চালিয়েছে। ভোর ৫টা ৪৫ মিনিট থেকে আমরাও পাল্টা গুলি চালাচ্ছি!

হিটলারের এই উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাষণে জার্মানির বয়স্করা বিস্ময় প্রকাশ করলেও তরুণ প্রজন্মের ওপর এর প্রভাব পড়েছিল। হামবুর্গের রাল্ফ ব্রাউয়ার এবং রেডিও দোকানের কর্মচারী ভের্নার মর্ক তাদের স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো ব্যাপক যুদ্ধ-উচ্ছ্বাস বয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়নি, বরং হিটলারের ভাষণ শেষে এক অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করছিল।

যুদ্ধের পরিণতি ও কারণ

পোল্যান্ডকে রক্ষা করতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানিকে সেনা সরিয়ে নিতে আলটিমেটাম দেয় এবং ৩ সেপ্টেম্বর তারা জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, যা বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে সারা ইউরোপ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এই যুদ্ধে সারা বিশ্বে প্রায় ৬ থেকে ৭.৫ কোটি মানুষ মারা যান, যার বড় একটি অংশ ছিল সাধারণ অসামরিক নাগরিক। সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ, চীনে ১ কোটি ৫০ লাখ, জার্মানিতে ৭০ লাখ এবং পোল্যান্ডে ৬০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল কারণ ছিল নাৎসিবাদী জাতীয় সমাজতন্ত্রের উত্থান এবং অ্যাডলফ হিটলারের পরিকল্পিত আগ্রাসী নীতি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভার্সাই চুক্তি, জার্মানিতে চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং দুর্বল ভাইমার প্রজাতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসিবাদের উত্থান ঘটে। এই যুদ্ধ ইউরোপের বহু ঐতিহ্যবাহী ধারার অবসান ঘটায়। প্রতিবছর জার্মানিতে ১ সেপ্টেম্বর ‘যুদ্ধবিরোধী দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।