গণভোটের রায় মেনে নেওয়ার আহ্বান: সরকারের কঠোর সমালোচনা

ঢাকা-র ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সতর্কবার্তা জারি করে বলেছেন, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অপরিনামদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে তার পরিণতি সরকারকেই বহন করতে হবে। তিনি মন্তব্য করেন, “মিসাইল ছুড়লে তার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে হয়, তা না হলে সেই মিসাইল কার বাড়িতে গিয়ে পড়বে কিংবা কাদের ক্ষতি করবে তার ঠিক থাকে না।” তিনি চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে সরকারকে গণভোটের রায় মেনে নেওয়ার তাগিদ দেন।

গণভোটের রায় এবং নতুন সাংবিধানিক সংকট

১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার: সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে কি-নোট পেপার উপস্থাপনকালে আইনজীবী শিশির মনির স্পষ্ট ভাষায় জানান, জনগণের দেওয়া গণভোটের রায়কে উপেক্ষা বা প্রত্যাখ্যান করা হলে বাংলাদেশ এক চরম সাংবিধানিক ও অনাস্থার সংকটের মুখোমুখি হবে। তিনি অনতিবিলম্বে গণভোটের ফলাফলকে পূর্ণ সম্মান জানিয়ে সংবিধান সংস্কার সভার (কনস্টিটিউশনাল রিফর্ম অ্যাসেম্বলি) অধিবেশন আহ্বান করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক সংকট দূর করতে হলে সাংবিধানিক কাঠামোর রূপরেখা দ্রুত স্পষ্ট করা প্রয়োজন। জনগণের মতামতকে অমান্য করে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় এবং ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে এ জাতীয় অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট ও আদালতের ভূমিকা

দেশের সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শিশির মনির বলেন, গণঅভ্যুত্থান কখনোই বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ মেনে সম্পন্ন হয় না, এটি সর্বদা প্রচলিত সংবিধানিক গণ্ডির বাইরে থেকে সংঘটিত হয়। বর্তমানে এই মৌলিক রাজনৈতিক বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন বিষয়ে পরিণত হওয়া নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি প্রত্যাশা করেন যে, আদালত পুনরায় খোলার পর সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আদেশের প্রশ্নটি উত্থাপিত হলে বিচার বিভাগ স্বাধীন ও মেরুদণ্ড সোজা রেখে দেশের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

সংবিধান সংস্কারের ধরণ ও প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, গণভোটের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিয়ে ১৮০ দিনের জন্য সংবিধান সংস্কার সভার অধিবেশন শুরু করতে হবে। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদকে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ—এই দুই ভাগে বিভক্ত করতে হবে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ১০০ আসন বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে, যেখানে প্রতিটি দল তাদের প্রাপ্ত মোট ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে আসন লাভ করবে। যদি এই গণতান্ত্রিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করা হয়, তবে তা জাতীয় ইতিহাসে একটি অত্যন্ত কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

আন্তর্জাতিক নজির ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বক্তব্য

শিশির মনির বিশ্ব রাজনীতির নানা উদাহরণ টেনে বলেন, সুইজারল্যান্ড থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত প্রায় ২৬টি দেশের ইতিহাস ও উদাহরণ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জনগণ গণভোটে রায় দেওয়ার পর সেই রায় কোনো নির্বাচিত বা ক্ষমতাসীন সরকার সরাসরি মানতে অস্বীকার করেছে—এমন কোনো দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে নেই।

রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আদালতে নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মূলত রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে চালু করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে আদালতের রায়ে অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়। ফলে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে দেশকে সীমাহীন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেমিনারে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-এর শীর্ষ নেতৃত্ব, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র প্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন এবং তারাও অবিলম্বে জুলাই সনদের মূল চেতনা ও রাজনৈতিক সংস্কারের রায় বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান।

#রাজনীতি #বাংলাদেশ #সংবিধান reform #গণভোট