জাতীয় সংসদে বিভিন্ন অঞ্চলের সমস্যা ও সংকট নিয়ে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য

জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার সময় দেশের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার সংকট, জাতীয় সংকট এবং নানাবিধ জনদুর্ভোগের চিত্র অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট, মূল্যস্ফীতি, অবকাঠামোগত নানা দুরবস্থা, নদীভাঙন এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এই আলোচনায় স্থান পেয়েছে। সংসদ সদস্যরা দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট লাঘবে এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনতে সরকারের কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

জ্বালানি সংকট ও কাপাসিয়ার আঞ্চলিক জনদুর্ভোগ

গাজীপুর-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামী-র সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আইউবী সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের বাস্তব ও তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ব্যক্তিগতভাবে আটটি পাম্প ঘুরেও নিজের গাড়ির জন্য কোনো জ্বালানি তেল পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে গাড়ি রেখে লোকাল পরিবহনে করে তাকে সংসদে আসতে হয়েছে। অথচ সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে প্রতিনিয়ত দাবি করা হচ্ছে যে দেশে তেলের কোনো সংকট নেই। সরকারের এই বক্তব্য এবং বাস্তবতার চরম বৈপরীত্যে তিনি গভীর ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কাপাসিয়া এলাকার ওপর দিয়ে জাতীয় গ্যাসের পাইপলাইন গেলেও স্থানীয় বাসা-বাড়ি ও শিল্পকারখানায় কোনো গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে এলাকায় নতুন কোনো ভারী বা হালকা শিল্প গড়ে ওঠেনি এবং তরুণদের মধ্যে ভয়াবহ কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে বেকার যুবসমাজ মাদকের দিকে ঝুঁকছে। তিনি দ্রুত এলাকায় গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানোর দাবি জানান। এছাড়া এলাকার ১৭৪২ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে প্রায় ১১৬০ কিলোমিটারই কাঁচা বলে তিনি জানান, যা বর্ষাকালে গ্রামীণ জনগণের জন্য চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি শীতলক্ষা নদীর ওপর নির্মিত একমাত্র সেতু থেকে নির্মাণ ব্যয়ের চার গুণেরও বেশি টাকা টোল আদায় করা সত্ত্বেও এখনও টোল বন্ধ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ঝালকাঠিতে নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব

এর পরপরই ঝালকাঠি-১ আসনের বিএনপি-র সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল তার এলাকার মানুষের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আইলা, সিডর ও বারবার আঘাত হানা ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসে স্থানীয় মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। নদীর পানির সঙ্গে অতিরিক্ত লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে এবং ক্রমাগত নদীভাঙনে হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি ঝালকাঠিতে নদীভাঙন প্রতিরোধে একটি বিশেষ টেকসই সরকারি প্রকল্প গ্রহণের জোর দাবি জানান। তবে সরকারি উদ্যোগে নতুন করে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হওয়ায় এলাকার মানুষ কিছুটা হলেও আশাবাদী বলে জানান।

মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা

চাঁদপুর-২ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন দেশের চলমান সীমাহীন মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, “দেশে এখন মূল্যস্ফীতি এমন এক ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সরাসরি তার তীব্র চাপ অনুভব করছে।” এতে মানুষের নিত্যদিনের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, মুদ্রার মান ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনধারণ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ছাপানোর ফলেই এই মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর সঙ্গে জড়িত দায়ী কর্মকর্তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

সর্বশেষে, সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামী সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপতির সর্বজনীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা উচিত, যাতে তিনি সব রাজনৈতিক দল ও জনগণের আস্থার প্রতীক হতে পারেন।

#জাতীয়সংসদ #বাংলাদেশ #অর্থনীতি #রাজনীতি