নির্বাচনী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং বর্তমান সরকারের অবস্থান

মিরপুর এলাকার পীরেরবাগে অনুষ্ঠিত ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-র আমির ডা. শফিকুর রহমান সরকারের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, জাতীয় নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকার দেশের শাসনব্যবস্থা ও সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার ব্যাপারে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে পরবর্তীতে নিরঙ্কুশ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনে সক্ষম হওয়ার পর তারা সেসব মূল প্রতিশ্রুতি থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে। বিরোধীদলীয় এই শীর্ষ নেতার মতে, শাসকদল তাদের অতীতের সব লিখিত ও মৌখিক ওয়াদা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতি ঘোর অসংবেদনশীলতা প্রদর্শন করছে।

৩১ দফা ইশতেহার, গণভোট ও সাংবিধানিক বিতর্ক

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, নির্বাচনী লড়াইয়ের পূর্বে শাসক দল নিজেদের ৩১ দফা ইশতেহারে স্পষ্ট ভাষায় রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেখানে গভীরভাবে অঙ্গীকার করা হয়েছিল যে, ক্ষমতায় আসার পর একটি নিরপেক্ষ সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে। সেই কমিশন সংবিধানের সেসব বিতর্কিত ধারা চিহ্নিত করে সংশোধন করবে, যেগুলো পূর্বে ক্ষমতাসীনদের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী আচরণ করতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, বর্তমানে বিরোধী দল বা সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে সংস্কারের দাবি উঠলেই সরকারি দলের প্রতিনিধিরা দাবি করছেন যে, সংবিধানে এ জাতীয় পরিবর্তনের কোনো সাংবিধানিক সুযোগ বা ভিত্তি নেই।

জামায়াত আমির ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, “যদি বর্তমান সংবিধানে সংস্কারের সুযোগ বা বিধান না-ই থেকে থাকে, তবে নির্বাচনের আগে কেন নিজেদের ৩১ দফায় সংস্কারের কথা স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল? কেনই বা সে সময় জনগণের কাছে গণভোটের দাবি তোলা হয়েছিল এবং দেশবাসীকে এই ইশতেহারের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল?” তিনি সরকারের এই অবস্থানকে স্পষ্ট দ্বিচারিতা বলে মন্তব্য করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধরণের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের ওয়াদার বরখেলাপ এবং জনগণের আমানত ও রায়কে চরম অবমাননা করার নামান্তর।

সংসদীয় সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ রাজপথের আন্দোলনের রূপরেখা

গণভোট প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন যে, জাতীয় সংসদে স্পিকার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দিয়ে হঠাৎ করেই আলোচনা সমাপ্ত ঘোষণা করেন, যা সংসদীয় রাজনীতিতে একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত। এই পদক্ষেপ সংসদীয় কার্যপ্রণালীতে ‘টক আউট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি দলের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে বিরোধী দলসমূহ গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছে এবং দেশের সাধারণ জনগণও ব্যথিত হয়েছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিনি জানান, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে ইতোমধ্যে তাদের প্রথম প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়েছে। তিনি ঘোষণা করেন, “এটি আমাদের দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের সূচনামাত্র। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, দেশের জ্বালানি সংকট ও শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব

বৈশ্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার তীব্র রাজনৈতিক যুদ্ধ ও উত্তেজনার দরুন সারা বিশ্বই এক অত্যন্ত কঠিন ও জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে বাংলাদেশ-এ জ্বালানি সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা অনুধাবন না করে সরকার এই মারাত্মক সংকট মোকাবিলায় দেশবাসীর সামনে সত্য তথ্য তুলে ধরছে না এবং কোনো প্রকার খোলামেলা আলোচনা বা সর্বদলীয় সংলাপ আয়োজন করতে পিছপা হচ্ছে।

জ্বালানি সংকটের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকা-র রাজপথগুলোতে প্রতিদিন তীব্র ও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। পেট্রল ও গ্যাসের অভাবে প্রধান সড়কগুলোতে শত শত যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির হয়ে আটকে থাকছে এবং মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়ে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি সরাতে দেখা যাচ্ছে। তিনি জরুরি ভিত্তিতে সকল রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় সংলাপের আহ্বান জানান।

একইসঙ্গে তিনি সরকারের সাম্প্রতিক শিক্ষানীতির তীব্র সমালোচনা করেন। জ্বালানি সাশ্রয়ের দোহাই দিয়ে দেশের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে অনলাইন বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে ক্লাস নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাকে তিনি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ক্ষতিকর হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলেন, একটি ক্লাসরুমে যেখানে ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসে পড়াশোনা করতে পারে, সেখানে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা বাড়িতে ডিভাইস ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি কোনোটিরই সাশ্রয় হবে না। বরং এর ফলে কোমলমতি শিশুদের প্রযুক্তির ওপর ক্ষতিকর নির্ভরতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষা একটি জাতির মূল মেরুদণ্ড, তাই এ জাতীয় কোনো দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

#রাজনীতি #বাংলাদেশ #সংস্কার #অর্থনীতি