ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা
রাজধানী ঢাকার বনানীতে অবস্থিত হোটেল শেরাটনে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। এই ইশতেহারে দেশের সার্বিক উন্নয়ন, শাসনব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে মোট ২৬টি বিষয়কে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, তারা আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারলে দেশের প্রশাসনিক ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার হলো পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে পিআর বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক পদ্ধতি কার্যকরভাবে প্রবর্তন করা। ইশতেহার ঘোষণার মূল অনুষ্ঠানে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব উপস্থিত থেকে দেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং গণমাধ্যমের সামনে বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেন।
নির্বাচনী ব্যবস্থার সুসংহত সংস্কার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি
জামায়াতে ইসলামী তাদের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। এতে উল্লেখ করা হয় যে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাই এই ব্যবস্থাকে চিরতরে সুসংহত ও সর্বাত্মক কার্যকরী করতে প্রয়োজনীয় সকল আইন, সংবিধানের বিধান এবং প্রবিধানমালা সময়োপযোগী সংস্কার করা হবে। এছাড়া দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তে আনুপাতিক বা পিআর পদ্ধতি চালুর অঙ্গীকার করা হয়েছে, যাতে প্রতিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের জনমতের সঠিক প্রতিফলন সংসদে ঘটে। ইশতেহারে আরও বলা হয় যে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে এবং সর্বস্তরের নির্বাচনী ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় নির্বাচন তদারকি
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইশতেহারে একটি বিশেষ প্রস্তাব যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদে ন্যূনতম ৯০টি আসন অথবা মোট সংগৃহীত ভোটের অন্তত ৩ শতাংশ লাভকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে। এসব দলের প্রতিনিধিরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচন কার্যালয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের অনিয়ম, কারচুপি বা পক্ষপাতিত্ব রোধ করা সম্ভব হবে বলে দলীয় সূত্রে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। এ ধরনের অংশীদারিত্বমূলক পদক্ষেপে দেশের সর্বস্তরের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকরা।
শিক্ষা খাতের মানোন্নয়ন, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও শিক্ষক মর্যাদা
শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক আধুনিকায়ন এবং শিক্ষালয়গুলোতে দুর্নীতি দূর করাকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। দেশের শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি ও সামাজিক মর্যাদার কথা বিবেচনা করে ইশতেহারে ঘোষণা করা হয় যে, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সকল স্তরের যোগ্য শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর স্কেল ও বেতন গ্রেড প্রদান করা হবে। “শিক্ষকদের উপযুক্ত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান ব্যতীত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়,”—এমন মন্তব্য করে দলটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, শিক্ষা খাতে সব ধরনের অনিয়ম উচ্ছেদ করা হবে। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বহু বছর ধরে চলা ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি কঠোর হাতে বন্ধ করতে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক এবং নিরপেক্ষ নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে এই ইশতেহারে। সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন টেকসই হবে না উল্লেখ করে বলা হয়, প্রতিটি নাগরিকের কল্যাণ ও নিরাপত্তা বিধানে রাষ্ট্র দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। জামায়াত নেতৃবৃন্দ আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, জনগণের সমর্থনে তারা সরকার গঠন করতে পারলে ঘোষিত ২৬টি অগ্রাধিকারমূলক প্রস্তাব দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে এবং দেশকে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্রে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
#রাজনীতি #বাংলাদেশ #নির্বাচন #ইশতেহার