সম্প্রতি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্যের একটি বক্তব্য সরকারি কলেজের শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর জেরে কেউ কেউ সরকারি কলেজগুলোতে উচ্চশিক্ষা বন্ধের পক্ষে মত দিচ্ছেন, আবার কেউ বলছেন এসব প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা দিতে হলে পৃথকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া উচিত। এই আলোচনা দেশের ঐতিহ্যবাহী কলেজীয় শিক্ষাব্যবস্থা এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই বিতর্ক নতুন নয়। আজকের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আবির্ভাবের অনেক আগেই এ দেশে কলেজীয় শিক্ষার সূচনা হয়েছিল। তখন কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটি শাখা বা ইউনিট মনে করা হতো, যেখানে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হতো। ভারতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা আসে। বাংলার জ্ঞানবিজ্ঞান, রাজনীতি ও সমাজসংস্কারের শ্রেষ্ঠতম পুরুষেরা শ্রীরামপুর কলেজ বা হিন্দু কলেজের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ষাট–সত্তরের দশকের অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তখন কলেজের শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
শূন্য দশকের পর সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়ে গেলে এবং বিশ্ববিদ্যালয় সহজ কর্মসংস্থানের উপায় হয়ে উঠলে কলেজীয় শিক্ষাব্যবস্থা আক্রান্ত হতে শুরু করে। ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের মাধ্যমে এই যাত্রার সূচনা হয়। দেশের একমাত্র সরকারি আর্ট কলেজটিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়ে যায়। একই প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো ও অর্থের উৎস সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকসংখ্যা ও অর্থ বরাদ্দে আমূল পরিবর্তন আসে। এর ফলে কলেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের কাছেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তবে এর ফলে শিক্ষাব্যয় বেড়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ১ নম্বর বেতন গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ পান, কিন্তু কলেজের শিক্ষকেরা ৪ নম্বর গ্রেডের পর আর এগোতে পারেন না। গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা পরিচালনার জন্য কলেজগুলোতে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি ও অবকাঠামোগত সুযোগ নেই। বরং সক্ষমতার বহুগুণ বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে কলেজগুলোকে একরকম হাটবাজারে পরিণত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় হলে সরকার উদার হস্তে বরাদ্দ দিতে থাকে, ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অধিক সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে। সাধারণ সরকারি কলেজের শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, সরকারি মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার মান নিয়ে কিন্তু কোনো উদ্বেগ নেই। সেখানেও সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং গবেষণার সুযোগ কম হলেও মৌলিক বিষয়ে শিক্ষক-সংকট তীব্র। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা ভালো রোজগারি হয়ে ওঠে, অর্থাৎ গবেষণার চেয়ে অর্থ এখানে মুখ্য। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজগুলোর চাকরি অধিক আকর্ষণীয় ছিল, কারণ সরকারি কলেজে পেনশন থাকলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ছিল না। কিন্তু ওই অধ্যাদেশের পর চিত্র বদলে যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদক্রমে উন্নয়ন ঘটে।
বাংলাদেশের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সবচেয়ে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হলেও, মেধাবীরা প্রায়শই উপজেলা পর্যায়ের কলেজে নিয়োগ পান, যেখানে গবেষণা ও পড়াশোনার চেয়ে প্রশাসনিক ক্রিয়াকে উৎসাহিত করা হয়। উচ্চশিক্ষা নিয়ে ফিরে আসা শিক্ষকেরাও বঞ্চনার শিকার হন, যা সহকর্মীদের নিরুৎসাহিত করে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী তরুণেরা, যাঁদের অন্য কোথাও কর্মসংস্থানের সামর্থ্য নেই, তাঁরা নিরাপদ সরকারি চাকরির প্রলোভনে সরকারি কলেজের চাকরি বেছে নেন। এভাবে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার একদল মেধাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো বিবেকবান নাগরিকের দায়িত্ব। অথচ তাঁদের যুক্তিহীনভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার ঘটছে, তাদের পরিণতি যে একদিন সরকারি কলেজের মতো হবে না—সেই গ্যারান্টি কে দেবে? শিক্ষার মান উন্নয়নে সম্মিলিত সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।