আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচন কমিশনে (ইসি) একটি লিখিত প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে। এই প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য হলো সীমান্ত পথে অবৈধ অস্ত্র, নকল টাকা এবং কালো টাকার অনুপ্রবেশ বন্ধ করা, যা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য।

গত বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) বিএনপির তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে এই প্রস্তাবনা পেশ করে। নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ রাখতে এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান। তার সঙ্গে ছিলেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া। এই তিনজনই বিএনপির নির্বাচন কমিশন বিষয়ক কমিটির সদস্য।

নির্বাচনকালীন পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

বিএনপি তাদের প্রস্তাবনায় নির্বাচনকালীন সময়ে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়েছে। দলটির মতে, একটি বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বেশ কিছু মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি। এর মধ্যে অন্যতম হলো, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বেই বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলসমূহের নেতাকর্মীদের নামে দায়েরকৃত মিথ্যা, বানোয়াট ও গায়েবি মামলাসমূহ প্রত্যাহার করা। এটি রাজনৈতিক পরিবেশকে স্বাভাবিক করতে সহায়ক হবে বলে বিএনপি মনে করে।

এছাড়াও, নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিএনপির প্রস্তাবনা অনুযায়ী, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বেই বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় প্রদত্ত সব অস্ত্র সরকারের কাছে জমা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে, সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা অগণিত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য আশু ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এই পদক্ষেপগুলো নির্বাচনী সহিংসতা রোধে এবং ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে দলটি দাবি করেছে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও কারচুপি প্রতিরোধ

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং কারচুপি প্রতিরোধের বিষয়েও বিএনপি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দিয়েছে। দলটির মতে, সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে এবং দূতাবাসগুলোতে চুক্তিভিত্তিক সব নিয়োগ বাতিল করা উচিত, যাতে নির্বাচনের সময় কোনো প্রকার প্রভাব বিস্তার করা না যায়। নির্বাচনকে অবাধ, বিশ্বাসযোগ্য, শান্তিপূর্ণ ও পক্ষপাতহীন হতে হবে এবং ভোটারদের স্বাধীন ভোটাধিকার প্রয়োগে সম্ভাব্য সব প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

বিএনপি আরও দাবি করেছে যে, নির্বাচনে সম্ভাব্য সব কারচুপির সুযোগ প্রতিরোধ করে নিখুঁত ও ত্রুটিমুক্ত ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে। ভোটকেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগে অর্থশক্তি, পেশিশক্তি ব্যবহার ও প্রভাব প্রতিরোধ করাও তাদের অন্যতম প্রধান দাবি। নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগত কোনো লোক নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবে না বলেও প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও ভোটারদের আস্থা

নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও বিএনপি তাদের প্রস্তাবনায় আলোকপাত করেছে। দলটির মতে, ইসি সদস্যদের সাংবিধানিক শপথের প্রতি অনুগত থেকে নিরপেক্ষ ও সাহসী হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে সংবিধান ও আইনের প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগে নির্ভীক হতে হবে। নির্বাচন যে অবাধ, নিরপেক্ষ ও কারচুপিমুক্ত হচ্ছে তা দেশ ও জাতির কাছে দৃশ্যমান হতে হবে। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি, বিতর্কিত বক্তব্য প্রতিরোধে প্রস্তুতি, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার রোধ, ধর্মীয় প্রলোভন বা ভীতি প্রদর্শন রোধ এবং ভোটকেন্দ্র ভোটারদের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া ও কম সংখ্যক ভোটার নিয়ে কেন্দ্র নির্ধারণের কথাও প্রস্তাবনায় রয়েছে, যাতে ভোটাররা সহজে ভোটদানে উৎসাহিত হন।