গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নির্বাচনী প্রস্তুতি থেকে শুরু করে দলীয় কার্যক্রমে দলটি এখন সরগরম। মুক্তিযুদ্ধ ইস্যু ও ধর্মীয় বিষয়সহ বিভিন্ন সমালোচনার মুখে জামায়াত তাদের অভ্যন্তরীণ নানান বিষয়ে সংস্কার কার্যক্রম চালাচ্ছে। এক বছর ধরে জামায়াতে ইসলামীর কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মঞ্চের সাজসজ্জা, দলীয় সভা-সমাবেশের পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানারসহ বিভিন্ন জায়গায় লাল-সবুজের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। সর্বশেষ জাতীয় পতাকার আদলে একটি লোগোও উন্মোচন করেছে তারা। দলীয় কার্যক্রমে জাতীয় পতাকার এমন ব্যবহারকে সংশ্লিষ্টরা দলটির দেশপ্রেম বোঝানোর কৌশল এবং মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে বিতর্কের অবসানের চেষ্টা বলে মনে করছেন। একাত্তরের প্রসঙ্গ ও দলের অবস্থান দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণার ক্ষেত্রে শিথিলতা, ৭১ প্রশ্নে ক্ষমা চাওয়া নিয়ে দলীয় আলোচনা, নারী প্রার্থী মনোনয়ন, জাতীয় পতাকার আদলে দলের লোগো বানিয়ে সংস্কার এবং দলের কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন আসছে। গত বছর প্রকাশ্যে দলীয় কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই জামায়াতে ইসলামী নানান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি (বিএনপি) থেকে শুরু করে নানান মহল দলটির মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার বিষয় নতুন করে সামনে আনে। জামায়াতের ভেতরেও ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জয়ের পর ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা রায়েরবাজারে শহীদ বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে গিয়ে দোয়া ও মোনাজাত করেন, যা মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে দলের অবস্থান জানানোর বিষয়টি আরও গুরুত্ব দেয়। যদিও দলের নির্বাহী পরিষদে এ বিষয়ে মতানৈক্য দেখা যায়। যুগের পরিবর্তন ও রাজনীতির চাহিদা অনুযায়ী নীতি-নির্ধারণে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো মৌলিক, কোনগুলো অভিযোজিত হবে সেগুলো আলাদা করে দেখা হয়। সব পার্টির আলাদা পলিসি আছে। আমরা ইসলামের মৌলিক বিষয় ঠিক রেখে সামাজিক অবস্থা অনুযায়ী পরিবর্তন আনছি। মৌলিক কোনো বিষয় আমাদের অ্যাভয়েড করার সুযোগ নেই। —মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও দক্ষিণাঞ্চলের (সাংগঠনিক) তত্ত্বাবধায়ক ৭১ বিষয় নিয়ে আমাদের আলোচনা আছে। কোনো মৌলিক ইস্যুতে নির্বাহী পরিষদে সিদ্ধান্ত হলেও সেটা আমাদের মজলিশে শুরা পরিষদ থেকে পাস করে নিতে হয়। মৌলিক বিষয়ে জামায়াতের সবাইকে একমত হতে হয়। এ বিষয় আলোচনাধীন। —মাওলানা আব্দুল হালিম, নির্বাহী পরিষদের অন্যতম সদস্য ও কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল রুকন মান শিথিলতা ও প্রার্থী নির্বাচন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দলের রুকন মান শিথিল করছে জামায়াত। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সৎ, যোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ মনে হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া হবে। ঢাকা-৭ আসনে হাজি হাফেজ এনায়েত উল্লাহ নামের একজন ব্যবসায়ীকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যিনি জামায়াতের একজন কর্মী। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন বলেন, "আমাদের টার্গেট যোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ লোক। যারা দুর্নীতি ছাড়া মানুষের আমানত রক্ষা করবে। সেক্ষেত্রে রুকন বা কর্মী দেখা হবে না।" লোগো সংস্কার ও নতুন বার্তা গত রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের পেছনে রাখা দলীয় পতাকা এবং দেওয়ালে লাগানো নতুন একটি লোগো সামনে আসে। এরপর থেকে দলের অভ্যন্তরে ও বাইরে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। আরবি শব্দ বাদ দেওয়ায় নেটিজেনরা বলছেন, জামায়াতের লোগো পরিবর্তনের বিষয়টি রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে। তারা সেক্যুলার হওয়ার এবং পশ্চিমাদের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করছে। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা পরিষদের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "লোগো দিয়ে কোনো দলকে পুরোপুরি রিড করা যায় না। আমাদের মূলনীতির সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখেই লোগো হবে।