বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব ড. গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর বিরুদ্ধে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি বঞ্চনা ও প্রতারণার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচনের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। একইসাথে, তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে একটি আদর্শিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করে তাদের প্রশংসা করেছেন।

গত শনিবার (১৯ জুলাই) ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশে ড. প্রামাণিক এই মন্তব্যগুলো করেন। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকে অস্বীকার করে আসছে। তিনি বলেন, হিন্দু সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের কাছে রাজনৈতিক বন্দি ছিল। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগ গঠিত হওয়ার দিন থেকেই তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব অস্বীকার করে, যা প্রতিনিধিত্ব ধ্বংসের উদ্দেশ্য নিয়েই গঠিত হয়েছিল। ড. প্রামাণিক দৃঢ়ভাবে অভিযোগ করেন যে, আওয়ামী লীগ হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

বিএনপি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ

ড. প্রামাণিক একইভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর বিরুদ্ধেও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি অবহেলা ও ক্ষতির অভিযোগ তুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ফেনীর একটি উপজেলায় প্রায় ২০০ জন হিন্দু নারীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে একজন আদিবাসী কিশোরীকে চারজন বিএনপি কর্মীর দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি জানান। ড. প্রামাণিক আক্ষেপ করে বলেন, এই সকল ঘটনার কোনো বিচার হয়নি, যা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি বিএনপির উদাসীনতা ও ক্ষতির প্রমাণ।

দেশের পরিস্থিতি ও জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা

ড. প্রামাণিক দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, বিশেষ করে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং টেন্ডারবাজির মতো বিষয়গুলো উল্লেখ করে। এই প্রেক্ষাপটে, তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে কেবল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং একটি ‘ইউনিভার্সাল ইউনিভার্সিটি’ বা সার্বজনীন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি উপস্থিত জনতাকে জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে নীতি ও আদর্শ শিক্ষা লাভের আহ্বান জানান, যা ধর্ম অনুযায়ী দেশ ও নিজের জীবন পরিচালনায় সহায়ক হবে।

তিনি সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে আশ্বস্ত করেন যে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে অংশগ্রহণের কারণে তাদের জীবন ধন্য হবে, এমনকি যদি রাজনৈতিক ক্ষমতা নাও থাকে। তার মতে, জামায়াতে ইসলামী নৈতিক ও আদর্শিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

ভবিষ্যৎ নির্বাচন ও ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধের দাবি

ভবিষ্যৎ নির্বাচন ব্যবস্থার বিষয়ে ড. প্রামাণিক ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধের ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি বলেন, “আমরা বলতে চাই একবার ফ্যাসিবাদ বিদায় হয়েছে। আবার কোনোদিন আমরা এই ফ্যাসিবাদ চাই না।” তিনি জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে সতর্ক করেন যে, যদি এই দেশে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি ছাড়া নির্বাচন হয়, তাহলে আবারও ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে এবং তা সরানোর জন্য জীবন ও রক্ত দিতে হবে।

ড. প্রামাণিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য এক দফা পৃথক নির্বাচন এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি ছাড়া কোনো নির্বাচন না করার দাবি জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “যদি জামায়াতে ইসলামী মনে করে, তাহলে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না।” তার এই বক্তব্য দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।