জাতীয় পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে, যা দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে পদ থেকে সরানোর তৎপরতা পর্যন্ত গড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই বিরোধের মূল কারণ হলো দলের গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা কমানোর উদ্যোগ। এই পরিস্থিতিতে, আগামী ২৮ জুন অনুষ্ঠিতব্য দলের সম্মেলন স্থগিত করেছেন চেয়ারম্যান জি এম কাদের, যা দলের অভ্যন্তরে বিভেদ আরও বাড়িয়েছে। দলীয় সূত্র অনুযায়ী, গঠনতন্ত্রের ২০(ক) ধারা সংশোধনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, দলের চেয়ারম্যান যেকোনো সময় যেকোনো পদবির নেতাকে দল থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন। জ্যেষ্ঠ নেতারা এই ধারা বাতিল করে ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের দাবি তুলেছেন, কিন্তু জি এম কাদের এই প্রস্তাবে রাজি হচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ সংকট গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেনাপ্রধানের বৈঠকে দলটি অংশ নিলেও, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনায় তাদের ডাকা হয়নি। এর পাশাপাশি, শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনকারীরা জাতীয় পার্টিকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার চেষ্টা করে। এসবের পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশন থেকেও দলটিকে সম্মেলন আয়োজনের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন দলটির নেতারা। এই পটভূমিতে, গত ২০ মে অনুষ্ঠিত দলীয় বৈঠকে ২৮ জুন সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র না পাওয়ার কারণ দেখিয়ে চেয়ারম্যান জি এম কাদের এককভাবে সম্মেলন স্থগিত করেন। তার এই সিদ্ধান্তে দলের দুই জ্যেষ্ঠ নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার বিস্ময় প্রকাশ করে পূর্বনির্ধারিত তারিখেই সম্মেলন আয়োজনের কথা জানিয়েছেন। গঠনতন্ত্র সংশোধনের দাবি দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, চেয়ারম্যান জি এম কাদের কিছু ইস্যুতে ছাড় দিতে রাজি নন এবং তার অনড় অবস্থানের কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, দলের বৈঠকে পার্টির আর্থিক হিসাব এবং গণতন্ত্রায়নের বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, "চেয়ারম্যান যেকোনো পদের নেতাকে দল থেকে বের করে দিতে পারেন। এটা বাদ দিয়ে গণতন্ত্র চর্চার কথা বলা হয়েছে। আমি নিজেও চেয়ারম্যানকে বলেছি অগণতান্ত্রিক এই ধারা বাদ দিতে সম্মত হতে। উনি এখনো রাজি হননি। বরং ভেন্যু না পাওয়ার কথা বলে তিনি এককভাবে সম্মেলন স্থগিত করেছেন।" অন্যদিকে, জি এম কাদেরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত প্রেসিডিয়াম সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী মনে করেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যানকে ছাড়া কোনো সম্মেলন বৈধ হবে না। তিনি বলেন, "দলীয় কাউন্সিল রাস্তায় হতে পারে না এবং সে কারণেই চেয়ারম্যান এটি স্থগিত করেছেন মাত্র। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রদের সঙ্গে সমস্যা হয়েছে বলে হয়তো কেউ কেউ হয়তো ঝামেলা এড়াতে চাইছেন। কিন্তু দল ভেঙে আগেও কেউ সফল হয়নি, এখনো হবে না।" নেতাদের বক্তব্য ও অবস্থান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, যারা জি এম কাদেরের সঙ্গে বিরোধে রয়েছেন, তারা তিনজনই বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতা হয়েও বিভিন্ন সময়ে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুও শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি চেয়ারম্যানকে জানিয়েছেন যে, দলে গণতন্ত্রায়নের প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে তিনি তার সঙ্গে মহাসচিব হিসেবে থাকবেন, অন্যথায় তিনি মহাসচিব প্রার্থী হবেন কিনা তা নিশ্চিত নন। প্রেসিডিয়াম সদস্য মাসরুর মাওলা দল ভাঙার চেষ্টার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যাদের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং যারা চলে গেছেন, এমন অনেককেই ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।