সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অপরাধ প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডাকাতি, ছিনতাই, খুন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ক্রমাগত ঘটেই চলেছে, যা জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর বনশ্রীতে এক জুয়েলারি ব্যবসায়ীকে গুলি ও কুপিয়ে ১৬০ ভরি স্বর্ণালংকার এবং এক লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এর আগে, উত্তরার এক দম্পতিকে কোপানো এবং টাঙ্গাইলে বাসে ডাকাতি ও শ্লীলতাহানির মতো ঘটনাও ঘটেছিল। অপরাধের পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক ঘটনা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মোট ১১৪৫টি মামলা হয়েছে, যা ২০২৩ সালের একই সময়ের ৭৬৩টি মামলার তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। শুধু জানুয়ারি মাসেই ২৪২টি মামলা হয়েছে, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৬৯ শতাংশ বেশি। ডিসেম্বরে ২৩০টি মামলা হয়েছে, যা ২০২৩ সালের একই মাসের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো: টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সাগরদীঘি ইউনিয়নের লক্ষণের বাধা এলাকায় শিক্ষাসফরের তিনটি বাসে ডাকাতি; নওগাঁর পত্নীতলায় সড়কে গাছ ফেলে একটি বাস ও একটি মাইক্রোবাসে ডাকাতি; ঢাকার আশুলিয়ার জিরানীতে নিজ বাসায় ডাকাতের গুলিতে অভিনেতা আজিজুর রহমান আজাদের আহত হওয়া; এবং ঝিনাইদহের শৈলকুপায় তিনজনের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার, যার দায় স্বীকার করে ‘কালু, জাসদ গণবাহিনী’ লেখা একটি মেসেজ পাওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ পুলিশের ভাষ্যমতে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ে এবং লজিস্টিকস ঘাটতির কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। নতুন সরকারের অধীনে পুলিশের কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় অপরাধীরা এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও ছিনতাই করছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও বেকারত্বও কিছু মানুষকে অপরাধের পথে ঠেলে দিচ্ছে। রাতের শেষ ভাগে পুলিশের টহল কম থাকায় ছিনতাইকারীরা এ সময় অপরাধ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতিতে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে বলে মনে করেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘টাকা থাকলে, বদ মতলব থাকলে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করার মতো অনেক কিছু করা যায়। আমাদের ব্যর্থতা আছে, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।’ জামিন পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়ানো পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে ২৮৯টি মামলায় ৭৫৮ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১১৫ জনই জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। পুলিশ বলছে, জামিন পেয়ে অপরাধীরা আবার অপরাধে জড়াচ্ছে। র‌্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, কয়েকশ ছিনতাইকারী গ্রেফতার হয়েছে। কিন্তু তারা আবার আদালত থেকে জামিন নিয়ে একই ছিনতাই কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি সরকারপক্ষের আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, আদালতে ছিনতাইকারীদের কার্যকলাপ ও এর ভয়াবহতা তুলে ধরতে, যাতে আদালত জামিন দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য ও পদক্ষেপ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগের দোসররা। তাদের হাতে প্রচুর টাকা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা চায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হোক। সেটাই করার চেষ্টা করছি। সফল হলে পদত্যাগের প্রসঙ্গ আসবে না।’ আইজিপি বাহারুল আলম জানান, রাতে ও দিনে ছিনতাই বেড়েছে।