সরকার ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে ‘এ’ ক্যাটাগরির (অতি-গুরুতর আহত) ৪৯৩ জনের নামের তালিকার গেজেট প্রকাশ করেছে। বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (গেজেট) হরিদাস ঠাকুরের সই করা এই গেজেট প্রকাশ করা হয়। এই গেজেটে আহতদের বিস্তারিত পরিচয় ও ঠিকানা সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়েছে। গেজেটে প্রতিটি আহত ব্যক্তির নম্বর, মেডিকেল কেস আইডি, সম্পূর্ণ নাম, বাবা-মায়ের নাম, স্থায়ী ঠিকানা, এবং তাদের বিভাগ ও জেলার নাম সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ জুলাই অভ্যুত্থানে গুরুতর আহতদের প্রতি সরকারের প্রাথমিক সহায়তার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আর্থিক সহায়তা ও ভাতা
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এই গেজেট প্রকাশের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান যে, ‘এ’ ক্যাটাগরির (অতি-গুরুতর আহত) ৪৯৩ জন ব্যক্তি এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এই ব্যক্তিরা চিকিৎসার পরও অন্যের সহায়তা ছাড়া স্বাভাবিক জীবনযাপনে অক্ষম বলে বিবেচিত। সরকার তাদের জন্য এককালীন পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এই এককালীন সহায়তা দুটি অর্থবছরে প্রদান করা হবে। প্রথমত, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) দুই লাখ টাকা প্রদান করা হবে। দ্বিতীয়ত, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) তিন লাখ টাকা প্রদান করা হবে। এই এককালীন সহায়তার পাশাপাশি, তালিকাভুক্ত প্রত্যেক ‘জুলাই যোদ্ধা’কে মাসিক ২০ হাজার টাকা করে ভাতা প্রদান করা হবে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সহায়তা করবে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা
শফিকুল আলম আরও উল্লেখ করেন যে, ‘এ’ ক্যাটাগরির আহতরা আজীবন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা পাবেন। তাদের শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য উপযুক্ত মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে দেশি-বিদেশি হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। এছাড়াও, তাদের কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কর্মসহায়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন সুবিধা প্রদান করা হবে। এই সুবিধাগুলো তাদের সমাজে পুনরায় সক্রিয় হতে সাহায্য করবে। আহতদের একটি বিশেষ পরিচয়পত্র দেওয়া হবে, যা দেখিয়ে তারা সরকারি বিভিন্ন সুবিধা সহজে গ্রহণ করতে পারবেন। এই পরিচয়পত্র তাদের অধিকার নিশ্চিত করবে এবং সরকারি পরিষেবা প্রাপ্তি সহজ করবে।
আহতদের অন্যান্য ক্যাটাগরি
জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণের জন্য সরকার মোট তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে। ‘এ’ ক্যাটাগরিতে অতি-গুরুতর আহত ৪৯৩ জন রয়েছেন, যাদের জন্য উল্লিখিত বিশেষ সুবিধাগুলো ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া, ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ৯০৮ জন আহত ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এবং ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ১০ হাজার ৬৪৮ জন আহত ব্যক্তি রয়েছেন। এই ক্যাটাগরিগুলো আহতদের আঘাতের তীব্রতা এবং তাদের প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সরকারের সামগ্রিক সহায়তা কার্যক্রমের অংশ।
গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্ট মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তার পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। এরপর একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণের পরপরই জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তার বিষয়ে দ্রুত এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই গেজেট প্রকাশ এবং সহায়তা কার্যক্রম সেই উদ্যোগেরই একটি অংশ, যা ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা প্রকাশ করে।