আলজেরিয়া থেকে প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন ৩২ জন বাংলাদেশি শ্রমিক। কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে পাড়ি জমানো এই শ্রমিকরা একটি রিক্রুটিং এজেন্সির প্রলোভনে পড়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। বেতন না পেয়ে এবং কর্মসংস্থান সংক্রান্ত জটিলতায় সাড়ে সাত মাস ভোগান্তির পর তারা দেশে ফেরেন। পরে, এই ভুক্তভোগী শ্রমিকরা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রবাস সাপোর্ট সেন্টারে তাদের অভিযোগ দায়ের করেন।
আলজেরিয়ায় শ্রমিকদের প্রতারণা ও দুর্ভোগ
শ্রমিকরা ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড ভিশন (আরএল-২১০০) নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আলজেরিয়া যান। নির্মাণ কাজের ভিসার জন্য এজেন্সি তিন থেকে চার লাখ টাকা নেয় বলে কর্মীরা জানান। তারা আলজেরিয়ার আলমিনহা কোম্পানিতে দুই বছরের চুক্তিতে যোগ দেন। তবে, এক মাস পাঁচ দিন কাজ করার পরই তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর কথা জানানো হয়। এজেন্সি থেকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও, পরে তাদের চাইনিজ ওয়ান প্রায়ান্ট নামের একটি কোম্পানিতে কাজ দেওয়া হয়। সেখানে প্রায় ১৪ ঘণ্টা কাজ করেও তারা কোনো বেতন পাননি বলে অভিযোগ করেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, চাইনিজ কোম্পানি বেতন এজেন্সিকে পরিশোধ করেছে বললেও এজেন্সি তাদের কোনো টাকা দেয়নি। ভার্চুয়াল এজেন্সি কর্মীদের ভিসার ব্যবস্থাও করেনি। একপর্যায়ে, চাইনিজ ইনচার্জ জানান যে, ভিসা না হলে তারা কাজ করতে পারবেন না এবং দুদিনের মধ্যে কোম্পানি ছাড়তে হবে। এজেন্সি ভিসার ব্যবস্থা করতে না পারায়, সে দেশে থাকা তার লোকের মাধ্যমে কর্মীদের একটি ঘরে একপ্রকার বন্দি করে রাখা হয়।
পরে এজেন্সি তাদের ভারতীয় কোম্পানিতে কাজের কথা বলে প্রত্যেকের কাছে ২০০ ইউরো দাবি করে। এরপর কিছু শ্রমিক কাজ পেলেও অনেকে কাজ না পেয়ে বাইরে চলে যান। এই সময়ে কাজ করতে গিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন নামের একজন কর্মী মারা যান। ভুক্তভোগী মো. জুয়েল জানান, আব্দুল্লাহ আল মামুনের জন্য এজেন্সি দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বললেও তা দেয়নি। নাটোরের সাহারুল ইসলাম নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান, তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং এজেন্সি থেকে টাকা ফেরত চান। শ্রমিকরা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) শরণাপন্ন হন এবং আইওএম তাদের আশ্রয় দিয়ে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
এজেন্সির বক্তব্য ও কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ
অভিযোগের বিষয়ে ভার্চুয়াল ভিশন এজেন্সির মালিক আমিনুল ইসলাম জানান, আট মাস বেতন না পাওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি বলেন, কর্মীরা চার মাস কাজ করে পালিয়ে গেছে এবং ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। তিনি আরও দাবি করেন যে, তিনি প্রত্যেকের কাছ থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন, সাড়ে চার লাখ টাকা নয়, এবং এর প্রমাণ তার কাছে আছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম জানান, এমন ঘটনা কাম্য নয়। তিনি বলেন, বায়রায় বর্তমানে কোনো কমিটি না থাকায় তারা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। তবে, যেহেতু প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ হয়েছে, তাই তিনি আশা করেন প্রশাসন এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার একান্ত সচিব মো. সারওয়ার আলম জানান, মন্ত্রণালয় ভুক্তভোগীদের এবং এজেন্সির সঙ্গে কথা বলেছে। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীরা যেসব দালালকে টাকা দিয়েছেন, সেই দালালদের থেকে টাকা উদ্ধারের দায়িত্ব এজেন্সিকে নিতে হবে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের টাকার বিষয়টি সমাধানে জোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতারণার শিকার অন্যান্য প্রবাসীরা
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশে গিয়ে ছয় মাসের মধ্যেই আবার দেশে ফিরেছেন এমন কর্মীর সংখ্যা এক হাজার ৯২৬ জন। এদের মধ্যে অধিকাংশ কর্মীই প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন বলে জানা গেছে।