তামাকজনিত রোগে মৃত্যু সাধারণ ঘটনা নয়, বরং এটি এক ধরনের হত্যাকাণ্ড। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সম্প্রতি এই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, তামাক ব্যবহারের কারণে যে মৃত্যুগুলো ঘটছে, সেগুলো আসলে হত্যাকাণ্ড, কারণ এই মৃত্যুগুলো এড়ানো সম্ভব। আমরা জেনেশুনে এই ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটতে দিচ্ছি, যা একটি সুস্থ সমাজের জন্য কাম্য নয়।
বৃহস্পতিবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে সিরডাপ মিলনায়তনে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারটির মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের অগ্রগতি ও তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে চিকিৎসকদের সম্পৃক্ততা’। এই সেমিনারে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের গুরুত্ব
উপদেষ্টা ফরিদা আখতার তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, একটি শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন একটি সুস্থ জাতি গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত থাকলেও, বাস্তবে কেউই এর ব্যবহার থেকে বিরত থাকি না। এই অসচেতনতা এবং উদাসীনতা তামাকজনিত রোগের বিস্তারকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। তাই, তামাক সেবন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে এর উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে বিক্রি পর্যন্ত একটি সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। তিনি আরও জোর দেন যে, তামাক কেবল মানবস্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর নয়, এটি পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে। পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তামাক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
তামাক ব্যবহার হ্রাসে সম্মিলিত প্রচেষ্টা
সেমিনারে উপস্থিত অন্যান্য বক্তারাও তামাক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, কঠোর তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন এবং এর কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমেই তামাকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব। এটি বিশ্বব্যাপী একটি স্বীকৃত এবং প্রমাণিত পদ্ধতি, যা অনেক দেশেই সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। বক্তারা আরও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, দেশে একটি শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনই পারে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে তামাকজনিত স্বাস্থ্য ঝুঁকি, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে। এর মাধ্যমে একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সেমিনারের অংশগ্রহণকারীগণ
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ-এর মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ফজিলা-তুন-নেসার সভাপতিত্বে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের কর্মসূচি পরিচালক) শেখ মোমেনা মনি এবং জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক মো. আখতারউজ-জামান। এছাড়াও, ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের লিড পলিসি অ্যাডভাইজার মো. মোস্তাফিজুর রহমান সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন এবং তামাকমুক্ত সমাজ গঠনে তার মতামত ব্যক্ত করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী। অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক এবং অ্যান্টি টোব্যাকো অ্যাডভোকেসি বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের মেম্বার সেক্রেটারি ডা. মুহাম্মদ সাখাওয়াত হোসাইন। দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে কর্মরত অর্ধ-শতাধিক ডাক্তার ও নার্স এই গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে অংশ নেন, যা তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারকে আরও সুদৃঢ় করে এবং এই আন্দোলনে চিকিৎসকদের সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।