অন্তর্বর্তী সরকারের হুট করে একশোরও বেশি পণ্য ও সেবার ওপর ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি, নতুন কর আরোপ ও কিছু পণ্যের কর অব্যাহতি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএ能পি)। দলটি অবিলম্বে বর্ধিত ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে সরকারকে খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়েছে এবং রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য ১২টি উৎস ও ব্যবস্থার সুপারিশ উপস্থাপন করেছে।

সংবাদ সম্মেলন ও প্রধান দাবি

শনিবার (১৮ জানুয়ারি) গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভ্যাট‑ট্যাক্স বাড়ানোর ইস্যু নিয়ে কথা বলেন এবং এসব সুপারিশ উত্থাপন করেন। বিএনপি সরকারের সিদ্ধান্ত থেকে সাধারণ জনগণের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে এবং বলেছে, খরচ কমিয়ে ও বিকল্প উৎস খুঁজে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব।

বিএনপির আর্থিক অভিযোগ ও ব্যয় কাটছাঁটের পরামর্শ

বিএনপি জানিয়েছে, অনাবশ্যক ও দুর্নীতিগ্রস্ত মেগা প্রজেক্টের বিপরীতে বরাদ্দ রাখা অর্থ আপাতত বন্ধ রেখে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা যেতে পারে। দলটি উল্লেখ করেছে যে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বর্তমান বাজেটে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, আর ২০২৩‑২৪ অর্থবছরে এ পরিমাণ ৩২ হাজার কোটি টাকা ছিল। দলটির বক্তব্য অনুসারে, গত ১৪ বছরে এসব কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ওপর লুটপাট হয়েছে এবং শ্বেতপত্র কমিটির তদন্তে উন্নয়ন বাজেটের ৪০ শতাংশ লুটপাট হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।

বিজ্ঞানভিত্তিক ও পরিকল্পিতভাবে অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ হ্রাস করে বাজেটের আকার যৌক্তিকভাবে ছোট করে আনা এবং অব্যবহৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেই ব্যয় কমিয়ে রাজস্বক্ষেত্র পরিপন্থী চাপ কমানো সম্ভব বলে বিএনপি জানিয়েছে।

রাজস্ব বৃদ্ধির ১২ সুপারিশ

  • প্রত্যক্ষ করের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্লাবে ইনকাম ট্যাক্সের হার বৃদ্ধি ও সারচার্জ/ওয়েলথ ট্যাক্স বাড়িয়ে কর আহরণে মনোযোগ বাড়ানো ও নন‑ট্যাক্স ও নন‑রেভিনিউ খাতে আয় বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া। ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ।
  • টিআইএন নম্বরধারীদের রিটার্ন সাবমিট ও কর আদায় নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
  • করযোগ্য আয় করের আওতায় আনা যাতে কর ফাঁকি রোধ ও রাজস্ব বাড়ে।
  • দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জব্দকৃত সম্পদ বা ফ্রিজকরা অ্যাকাউন্টের অর্থ আইনানুগভাবে ব্যবহার করার প্রস্তাব।
  • কালো টাকা উদ্ধারের জোরালো চেষ্টা, ব্যাংকের লুণ্ঠিত টাকা ও নন‑পারফরম্যান্স লোনের টাকা উদ্ধার করা। শ্বেতপত্র অনুযায়ী দুর্নীতি ও লুটপাট থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা) উদ্ধারের দাবি উত্থাপিত হয়েছে।
  • আইএমএফ ও দাতা সংস্থার শর্ত ও অনুদান/ঋণের বিষয়গুলোতে কূটনৈতিক পদ্ধতিতে প্রো‑অ্যাকটিভ হওয়া এবং কঠিন শর্ত শিথিলের চেষ্টা করা।
  • পতিত সরকারের সময় প্রদত্ত অনৈতিক কর অব্যাহতি বন্ধ করে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আয় সম্প্রসারণ।
  • বৃহৎ ঋণ খেলাপিদের অপরাধ ও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে পদক্ষেপ নেওয়া।
  • রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে দুর্নীতির অবসান ঘটানো।
  • কর ফাঁকি রোধে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার ও এনবিআরের অটোমেশন নিশ্চিত করা।
  • এনবিআরের বর্তমান কাঠামোতে সংস্কার না করলে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি অসম্ভব—এমন দিক বিবেচনা করা।
  • অর্থনীতির অন্যতম মূল উৎস কৃষির ওপর জোর দিয়ে উৎপাদন বাড়ানো ও ক্ষুদ্র উৎপাদকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান অবস্থায় আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি বাজেট ঘাটতি মোকাবিলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে খরচ কমিয়ে ও আয় বাড়িয়ে ঘাটতি কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব। তিনি সাধারণ জনগণের ওপর কর আরোপে বিরূপ এমন সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জাবিউল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।