জুলাই থেকে আগস্টে দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে হেলিকপ্টার ও গুলি-শব্দ শিশুর মধ্যে ভয়, আতঙ্ক ও মানসিক সমস্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। অনেক শিশু ইতোমধ্যেই জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে; চিকিৎসকরা বলেন এদের মধ্যে ঘুমের ব্যাঘাত, ভয়-পাগলানো আচরণ, পড়াশোনায় অনমনীয় মনোযোগ ও ফ্ল্যাশব্যাক দেখা যাচ্ছে।

আন্দোলনকালে সরাসরি সহিংসতা প্রত্যক্ষ করায় কিংবা গণমাধ্যমে দেখার পর শিশুরা ট্রমাটাইজড হয়েছে—চিকিৎসকরা এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পরিবারগুলোতেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে; অভিভাবকদের ঘন ঘন সতর্কতা ও আলোচনা শিশুর উদ্বেগকে বাড়িয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।

কোন ঘটনা কীভাবে শিশুদের প্রভাবিত করেছে

ঢাকার প্রগতি সরণি, বসুন্ধরা ও বাড্ডা এলাকায় হেলিকপ্টার ও গুলির শব্দ শুনে ছোট্ট শিশুরা আতঙ্ক পায়। এক ছয় বছর বয়সি শিশু রাফসান হঠাৎ শব্দ পেলেই মা-বাবার কাছে লুকিয়ে পড়ে এবং বের হতে দেয় না। আরেক দেড় বছরের আবরার আওসাফ জাহিন হেলিকপ্টার দেখলেই ভাঙা উচ্চারণে ‘‘গুয়ি… গুয়ি…’’ বলে ভয়ে কাঁদে।

একাধিক ঘটনায় সরাসরি গুলিবিদ্ধ হয়ে শিশু মারা যাওয়ার সংবাদ শিশুর মানসিক দিকটিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০ জুলাই রায়েরবাগে চার বছর বয়সি আবদুল আহাদ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান; ২৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা ছয় বছরের রিয়া গোপ গুলিবিদ্ধ হন। এসব খবর পরিবারে আলোচনা হতে থাকলে শিশুদের দুশ্চিন্তা বাড়ে।

চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণ

“মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসারত শিশুদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে তারা স্বাভাবিক কাজ করতে গেলে ভয় কিংবা আতঙ্কগ্রস্ত থাকছে। পড়াশোনায় আগের মতো মনোযোগ দিতে পারছে না,”

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার জানান, আন্দোলনের পর মানসিক ট্রমার উপসর্গ নিয়ে তাদের সংস্কারে রোগী বেড়েছে; কিছু রোগী এখনও চিকিৎসাধীন। এক গবেষণায় গুলিবিদ্ধ ২৬ জন রোগীর মধ্যে ৪২ শতাংশ দুশ্চিন্তাগত, ৫৩ শতাংশ ঘুমের সমস্যা ও ১১ শতাংশ বিষণ্নতায় ভুগছেন বলে দেখা গেছে।

লক্ষণ ও পরামর্শ

চিকিৎসকরা বলেছেন, শিশুদের মধ্যে যে লক্ষণগুলো বেশি দেখা যাচ্ছে তা হলো:

  • ঘুমে ব্যাঘাত ও ভীতিকর স্বপ্ন
  • আতঙ্কগ্রস্ত হওয়া ও সহজে চমকে ওঠা
  • পড়াশোনায় মনোযোগ হারানো
  • অন্যের ট্রমার কথা শুনে বা ভিডিও দেখে ভীতি অনুভব করা

বিশেষজ্ঞরা পরিবারের সদস্যদের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন—শিশুকে কথা বলার সুযোগ দিন, তাদের অনুভূতি শুনুন, নিয়মিত রুটিন বজায় রাখুন এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবকের সহায়তা নিন। কিছু এনজিও ও ফাউন্ডেশন আক্রান্ত শিশুদের জন্য কাউন্সেলিং ও সাপোর্ট দিচ্ছে এবং প্রতিবন্ধী ও আহতদের আর্থিক সহায়তার কথাও বলা হয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন, ট্রমা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে এবং শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য পারিবারিক, স্কুলভিত্তিক ও সমাজভিত্তিক সহায়তা জরুরি।

চূড়ান্তভাবে বলা হচ্ছে, জুলাই–অগাস্ট আন্দোলন থেকে সৃষ্ট সহিংসতার পর শিশুদের মানসিক ক্ষত নিরীক্ষণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং প্রদান করা आवश्यक যাতে তারা দ্রুত ও স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।