জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত তাপপ্রবাহের কারণে গর্ভবতী নারীদের অকাল প্রসব এবং কম ওজনে সন্তান জন্মানোর ঝুঁকি বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি পরিসংখ্যান নির্দেশ করছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় স্বাস্থ্য‑গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে অপরিণত শিশুর জন্ম হার এবং নবজাতক মৃত্যুই বাড়ছে; বাংলাদেশের পরিস্থিতি এহেতু বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জনে অকাল জন্মহার ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ, যা ১০৩টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। কম ওজনের জন্মহার দিক থেকে দেশটি ১৫৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে আছে। দেশে বছরে চার লাখ ৮৮ হাজার ৬০০ থেকে সাত লাখ ৫৪ হাজার ৯০০ অপরিণত শিশুর রেকর্ড বিভিন্ন সময়ে কিউব করা হয়েছে এবং দৈনন্দিন হিসেবে প্রতি ঘণ্টায় বেশ কয়েকটি অপরিণত শিশু জন্ম নিচ্ছে।
গবেষণা ও মূল তথ্য
গবেষণায় বলা হয়, গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে গর্ভবতী নারীদের অকাল প্রসবের সম্ভাবনা ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং তীব্র তাপপ্রবাহের দিনে ঝুঁকি ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। নিউট্রিশন ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাপপ্রবাহ বৃদ্ধির ফলে জন্মের সময় শিশুর ওজন কমে এবং মৃত প্রসবের সংখ্যা বাড়তে পারে।
আইসিডিডিআর,বির তথ্যমতে, দেশে বছরে চার লাখ ৮৮ হাজার ৬০০ অপরিণত শিশুর সংখ্যা হিসেবে নির্ধারিত হলেও গত কিছু বছরে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অকাল জন্মহার সবচেয়ে বেশি এবং কম ওজনে শিশুর হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
গর্ভবতী নারীর প্রতি তাপের প্রভাব
গর্ভাবস্থার সময় অতিরিক্ত তাপ মা ও ভ্রূণের উপর শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে; এর ফলে অকাল প্রসব, গর্ভপাত, কম ওজনসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাপপ্রবাহে পানিশূন্যতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রসূতি জটিলতা বাড়ার আশঙ্কাও বেশি।
“তাপমাত্রা বৃদ্ধি মূলত দুভাবে স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। শক ও স্ট্রেস। বিগত পাঁচ-দশ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনে মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে তেমন কথা না বলা হলেও ইদানীং বলা হচ্ছে। প্রায় ৭০টি গবেষণায় দেখা গেছে যে তাপমাত্রার সঙ্গে মাতৃস্বাস্থ্যের সম্পর্ক আছে। এমনকি সম্প্রতি ১৪টি দেশের জনসংখ্যাগত স্বাস্থ্য জরিপ এবং আবহাওয়া উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একই তথ্য পাওয়া গেছে।”
অনেক চিকিৎসক জানান, তীব্র গরমে বাইরে বেশি কাজ বা দৌড়ঝাঁপ করলে গর্ভে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিছু মায়ের অভিজ্ঞতা হিসেবে আছে যে তাঁদের সন্তান নির্ধারিত সময়ে আগেই জন্ম নিয়েছে বা জন্মের সময় ওজন খুব কম ছিল।
প্রতিকার, নির্দেশিকা ও সুপারিশ
স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতguideline অনুযায়ী তাপমাত্রা স্তরকে মৃদু, মাঝারি, তীব্র ও অতি তীব্র হিসেবে শ্রেণিভূক্ত করা হয়েছে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকায় ৩৬–৩৭.৯°C মৃদু, ৩৮–৩৯.৯°C মাঝারি, ৪০–৪১.৯°C তীব্র ও ৪২°C বা তার বেশি অতি তীব্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, গর্ভবতী নারীকে তীব্র গরমের সময় বাইরে কম পাঠানো, পর্যাপ্ত পানি পান নিশ্চিত করা, ছায়াযুক্ত ও শীতল স্থানে রাখার ব্যবস্থা এবং গর্ভকালীন সেবায় অতিরিক্ত সচেতনতা ও কাউন্সেলিং জরুরি। পাশাপাশি এ বিষয়ে আরও সমীক্ষা ও লক্ষ্যভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন বলে ঐতিগৃহীত গবেষকরা উল্লেখ করেন।
উপসংহারে বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে অপরিণত সদস্যের সংখ্যা ও ঝুঁকি বাড়ছে এবং এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা, জনসচেতনতা ও গবেষণার সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।