১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকেই কাশ্মীর প্রশ্নটি ভারত ও পাকিস্তানের গতিপথকে প্রভাবিত করে আসছে। উভয় দেশই সমগ্র কাশ্মীরের ওপর দাবি করে এবং ভূখণ্ডটির পৃথক অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ঐতিহাসিকভাবে কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা মূলত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিরোধ অথবা ভারত-শাসিত কাশ্মীরের অস্থিরতাকে কেন্দ্র করেই হয়েছে। তবে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর বিশ্ববাসীর মনোযোগ খুব কমই পেয়েছে, যেখানে গত জুনে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এই অঞ্চলে একটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সংগ্রাম গতি পেয়েছে, যার মূল বিষয় সার্বভৌমত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্যে রয়েছে অসহনীয় বিদ্যুৎ বিল, খাদ্যের ক্রমবর্ধমান দাম এবং কর্মসংস্থানের সংকট। পাকিস্তানের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট থেকে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরও মুক্ত নয়। মূল্যবৃদ্ধি, রাজস্বসংকট, জ্বালানিঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে বারবার ঋণসহায়তা নিতে হওয়ায় সরকার ভর্তুকি কমাতে এবং ইউটিলিটি সেবার দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। কাশ্মীরে বেশ কয়েকটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো পাকিস্তানের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এ অঞ্চলের অনেক বাসিন্দার যুক্তি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাঁদের ভূখণ্ডের অবদানের প্রতিফলন স্থানীয় বিদ্যুতের দামে আরও ভালোভাবে থাকা উচিত। বিদ্যুতের দাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ২০২২ সাল থেকেই সময়–সময় বিক্ষোভ হয়েছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানে স্থানীয় সরকারের ব্যর্থতা নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য সুযোগ তৈরি করে। বিভিন্ন জেলায় নাগরিক কমিটি গড়ে ওঠে, যেখানে ব্যবসায়ী, আইনজীবী, শিক্ষার্থী ও কমিউনিটি নেতারা যুক্ত হন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এসব কমিটি একত্র হয়ে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) গঠন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল পুরো অঞ্চলে আন্দোলন ও গণসংগঠনের কার্যক্রম সমন্বয় করা। প্রাথমিকভাবে জেএএসি গম ও বিদ্যুতের দাম কমানো, মন্ত্রী ও আমলাদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করা এবং নির্বাচিত স্থানীয় সরকারকে অধিক ক্ষমতায়নের দাবি জানায়। সংগঠনটি পাকিস্তানের প্রচলিত রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থার বাইরে থেকেছে এবং নিজেকে একটি নির্দলীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপন করেছে। জেএএসির সংগাঠনিক তৎপরতার জবাবে কর্তৃপক্ষ এর সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের সভা-সমাবেশ সীমিত করে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হয়। ধর্মঘট, পরিবহন বন্ধ ও স্থানীয় বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে আন্দোলন চলতে থাকে। আন্দোলনটির শক্তি এর বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোতে নিহিত। ২০২৪ সালের মে মাসে সরকার তাদের দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দিলেও বাস্তব কোনো ছাড় দিতে দেরি করলে জেএএসি লংমার্চ ও সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই কর্মসূচিতে কয়েক লাখ বিক্ষোভকারী রাজধানী মুজাফ্ফরাবাদের দিকে অগ্রসর হয়। লংমার্চ ঠেকানোর চেষ্টা উল্টো ফল দেয় এবং আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। ২০২৪ সালের মে মাসের লংমার্চ চলাকালে সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে তিনজন ছিলেন বিক্ষোভকারী এবং একজন পুলিশ কর্মকর্তা। শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদ হস্তক্ষেপ করে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি রুপি বা ৮ কোটি ২৯ লাখ ডলার মূল্যের একটি ত্রাণ প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ভর্তুকিযুক্ত বিদ্যুৎমূল্য ও গমের দাম কমানোর ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সরকারের দমনমূলক প্রতিক্রিয়া ইউটিলিটি সেবার মূল্য নিয়ে শুরু হওয়া একটি আন্দোলনকে আরও বৃহত্তর প্রশ্নে পরিণত করে—পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের মানুষ আদৌ কতটা অর্থবহ রাজনৈতিক অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এই ভূখণ্ডের নিজস্ব রাষ্ট্রপতি, সরকার, আইনসভা ও আদালত রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও বৈদেশিক বিষয়ে পাকিস্তান এখনো নির্ণায়ক প্রভাব বজায় রেখেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পরিচালিত একটি কাউন্সিল একসময় আইন প্রণয়ন, অর্থব্যবস্থা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর ইসলামাবাদের আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান উৎস ছিল।