আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যদিও বর্তমান সংসদে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এই নির্বাচনকে অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ফলে, বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়া প্রায় নিশ্চিত।
জাতীয় সংসদের সভাকক্ষে আজ বেলা দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। সংরক্ষিত নারী সদস্যসহ মোট ভোটার ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির আসলাম চৌধুরীর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়ায় তিনি ভোট দিতে পারবেন না।
এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির প্রার্থী দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামাত ইসলামী দলের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ। ১১-দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক দলগুলো হলো জাতীয় নাগরিক পার্টি (এন সি পি) ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। সংসদে বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির সদস্যসংখ্যা ২৪৭ জন, অন্যদিকে ১১-দলীয় ঐক্যের মোট সদস্য ৯০ জন।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও সাংবিধানিক অবস্থান
রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। সংবিধানে তাঁকে রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর নামেই রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি মূলত রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান নন। ফলে তাঁর পদের মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিক গুরুত্ব যতটা, নির্বাহী ক্ষমতা ততটা নয়।
সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। এই দুটি ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে প্রায় সব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। সংসদ নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করতে বাধ্য নন।
রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো দণ্ড মওকুফ বা কমানোর ক্ষমতা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তিনি যেকোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ড মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করতে পারেন।
দায়মুক্তি ও অপসারণ প্রক্রিয়া
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হয় না। তাঁর কার্যকাল চলাকালে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা করা যায় না বা তাঁকে গ্রেপ্তার করা যায় না। তবে সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যায়। শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও তাঁকে পদ থেকে অপসারণের বিধান রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস হতে হয়।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য কমপক্ষে ৩৫ বছর বয়স হতে হয় এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয়। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায়।
বেতন ও অন্যান্য সুবিধা
রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, যা আয়করমুক্ত। প্রধানমন্ত্রীর মাসিক বেতন ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পরও কিছু সরকারি সুবিধা পান।
রাষ্ট্রপতির জন্য বঙ্গভবন নামে বিশাল সরকারি বাসভবন নির্ধারিত। এর সাজসজ্জা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়। সরকারি যাতায়াতের জন্য গাড়ি ও পরিবহনসুবিধা, চিকিৎসা (নিজ ও পরিবারের জন্য), আপ্যায়ন ভাতা এবং সরকারি কাজে বিদেশ সফরে ভাতা পান। রাষ্ট্রপতির জন্য বছরে ২ কোটি টাকার স্বেচ্ছাধীন তহবিল রয়েছে। এছাড়া বিমানভ্রমণের জন্য বছরে ২৭ লাখ টাকার বিমাসুবিধাও রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।