পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে দুই দিনের মধ্যে আদিয়ালা কারাগার থেকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। এই আদেশে দেশটির রাজনৈতিক ও আইনাঙ্গনের অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে প্রায় তিন বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) জন্য রাজনৈতিক পরিসর তৈরির ইঙ্গিত মিলছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক ও আইনবিষয়ক কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করেন, ইমরান খানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অন্যথায় এমন আদেশ দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন। আদেশের প্রতিক্রিয়া ও আইনি প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) কিছুটা বিভ্রান্ত বলে মনে হচ্ছে। দলটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা এই আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পিএমএল-এন সিনেটর নাসির বাট এ ঘটনাকে নওয়াজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন। আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার জানিয়েছেন, ফেডারেল সরকার সুপ্রিম কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করবে। তিনি ইমরান খানকে সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। একজন জ্যেষ্ঠ আইন কর্মকর্তাও সব বন্দীকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা মনে করেন, ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর পর উচ্চতর বিচার বিভাগের ক্ষমতা অনেকটা দুর্বল হয়ে গেছে। রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত ও সমালোচনা পিএমএল-এন-এর জ্যেষ্ঠ নেতারা যুক্তি দিয়েছেন যে, আদেশটি তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে এটিকে ‘কিছু মহলের’ সম্মতিতে দেওয়া নির্দেশ হিসেবে দেখা হতে পারে। তাঁরা বলেছেন, পিটিআইয়ের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতার শেষ পরিণতি ইমরান খানের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করবে। সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল তারিক মাহমুদ খোখর পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়ার বিচারিক নির্দেশনাকে ‘দেশ ও প্রবাসী জনগণের সম্মিলিত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার মুহূর্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন। খোখর বলেন, "এই ঘটনা ‘শরিফ ও জারদারি পরিবারের জন্য ভালো কোনো ইঙ্গিত নয়’। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে ‘অসাংবিধানিক শক্তি, পিএমএল-এন ও পিপিপির অশুভ ত্রিশক্তির মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক নেই’।" খোখর আরও বলেন, ‘ফরম ৪৭-এর সমাধান আসলে কোনো সমাধান নয়।’ তিনি মনে করেন, পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থাকে ‘রাজনৈতিক, প্রেটোরিয়ান [সামরিক হস্তক্ষেপনির্ভর] এবং অসাংবিধানিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল’ বলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, বিচারিক আদেশের মাধ্যমে ইমরান খানকে আদিয়ালা কারাগার থেকে শিফা হাসপাতালে নেওয়াকে তাঁরা ‘বৈধতার আবরণ’ হিসেবে দেখছেন। খোখর বলেন, ‘যা-ই হোক না কেন, পাকিস্তানজুড়ে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনের গতি ইমরান খান ও দেশের পক্ষে যাচ্ছে।’ সাবেক ফেডারেল মন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী এই ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ ‘সুস্থ রাজনৈতিক অগ্রগতির নতুন এক যুগের’ সূচনা করতে পারে এবং সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে আলোচনা সঠিক পথে এগোচ্ছে। তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক পরিসর দেওয়া এবং সংলাপের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। সাবেক আইন কর্মকর্তা ওয়াকার রানা সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে ‘খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আদালত মূলত সংবিধান ও নাগরিকদের সেই অধিকার সমুন্নত রেখেছেন। রানা বর্জনের রাজনীতির অবসান ঘটানোর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তবে একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের আদেশের সমালোচনা করেছেন এবং এর ব্যাপকতর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রতিবেদনটি নিজেই ‘বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ধরনের অভিযোগপত্র’। এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর প্রশ্ন, ‘অতিরিক্ত দেরির কারণেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। তাহলে এর দায় কার?