লেখক ও রাজনৈতিক সংগঠক ফিরোজ আহমেদ সম্প্রতি তাঁর ‘চব্বিশের কাঠগড়ায় প্রগতিশীল রাজনীতি’ শীর্ষক নিবন্ধের ওপর প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার জবাব দিয়েছেন। ১৬ জুলাই প্রথম আলোর বিশেষ সংখ্যা ‘অভ্যুত্থানের অন্দরে’-তে প্রকাশিত এই লেখাটি বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির আত্মপর্যালোচনাকে কেন্দ্র করে। ফিরোজ আহমেদ তাঁর প্রতিক্রিয়ায় চব্বিশের অভ্যুত্থানে প্রগতিশীল কর্মীদের অবদান, সমালোচনার পেছনের অভিসন্ধি খোঁজার প্রবণতা, প্রগতিশীল দল ও শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকার পার্থক্য এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির অভাবসহ চারটি প্রধান বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি তাঁর লেখার কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে বিষয়টি আরও একবার পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রগতিশীলদের দূরে সরে থাকার রাজনৈতিক তাৎপর্য এখনো অনেকে উপলব্ধি করতে পারেননি। এই বিচ্ছিন্নতার ফলস্বরূপ চব্বিশের অভ্যুত্থানে প্রগতিশীলদের বিপন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং উগ্র ডান রাজনৈতিক মহল নারীর অধিকার, মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ পায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম আন্দোলন যেখানে প্রগতিশীলেরা (একটি সংগঠন ছাড়া) নেতৃত্ব, দিকনির্দেশনা বা গড়ে তোলার কোনো স্তরেই উপস্থিত ছিলেন না। প্রগতিশীলদের একটি বড় অংশ এই আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী বা ‘রাজাকার’দের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন বলে মনে করতেন। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে নতুন একদল নেতা আবির্ভূত হন। যদিও একটিমাত্র প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পরিসরে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, যার সুফল হিসেবে আদিবাসী কোটা, নারী কোটা এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষণের বিষয়ে একটি স্বীকৃতি আসে। হেলমেট বাহিনীর নিপীড়নের সময়ে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো সহমর্মিতা প্রদর্শন ও প্রতিবাদ করলেও, আন্দোলনকে নেতৃত্ব প্রদান বা শিক্ষার্থী-সমাজের স্বাভাবিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ তারা হারায়। জাতীয় রাজনীতিতে প্রশ্ন ওঠে, যদি হাসিনাকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সফল ঐক্য ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়া সম্ভব কি না। লেখকের মতে, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সব ক্ষেত্রেই তীব্র দমন-পীড়ন চলেছে। দেশে নির্বাচন বলে কিছু ছিল না। কিন্তু হাসিনার সর্বাত্মক নিপীড়ক শক্তির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ঐক্যের বিরোধিতা বা তাতে বাধা দেওয়ার নানান পর্ব প্রগতিশীল রাজনীতিতে দেখা গেছে। ২০১৮ সালের পর যখন স্পষ্ট হয় যে নির্বাচনের মাধ্যমে হাসিনার পতন ঘটানো যাবে না, তখন প্রগতিশীল রাজনীতিতে একটি সর্বাত্মক হতাশা আসে। কোটা সংস্কার আন্দোলনেই তরুণদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার যে নৌকা মাঝনদীতে এগিয়ে গিয়েছিল, তাতে চড়ার একমাত্র উপায় ছিল জাতীয় স্তরে ঐক্যের দ্রুতগামী তরি। কিন্তু এর বদলে প্রগতিশীলদের কাছ থেকে ‘আপদ-বিপদের তত্ত্ব’ এবং আওয়ামী লীগ-বিএনপি সবাইকে বাদ দিয়ে শুধু ‘বাম-বিকল্প’ গড়ে তোলার আহ্বান পাওয়া যায়। এমন পরিস্থিতিতে সব প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের দিক থেকে একটি সর্বাত্মক গণতান্ত্রিক ঐক্যের ক্ষেত্র তৈরি করা প্রয়োজন ছিল। বিরোধীদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী বা উগ্র মৌলবাদীদের বাদ দিয়ে বাকি সবাইকে যথাসম্ভব ঘনিষ্ঠ করা, অন্তত একসঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করা জনগণের মধ্যে দিশা ও আশাবাদ তৈরি করত। ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য গড়ায় ব্যর্থতার ফলে তরুণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর হয়। মাও সে–তুং এবং জোসেফ স্তালিনের মতো কমিউনিস্ট তাত্ত্বিকেরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময়ে শ্রেণিসংগ্রামের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাদের বড় অংশ এবং সংগঠকদের উল্লেখযোগ্য অংশ এই আন্দোলনের আদর্শিক অবস্থান সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। মাঠের কর্মীরা বারবার জনগণের প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছিলেন। ২০১৮ সালের তুলনায় দ্রুতগতিতে তারা আন্দোলনে ভূমিকা রাখলেও, আন্দোলন গড়ার সূত্রপাত, মতাদর্শ নির্মাণ ও কর্মসূচি নির্ধারণে সংগঠনগুলো পিছিয়ে পড়ে। সর্বশেষ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সূচনা জুন মাসেই ঘটলেও, গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য ৭ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক সমর্থন প্রদান করে।