মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনদের ভূমিকা এবং চ্যালেঞ্জ নিরসনে করণীয় শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাজেদা ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান পরিস্থিতি, বিদ্যমান সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়।
আলোচকরা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যকে জীবনচক্রের প্রতিটি ধাপে আলাদা দৃষ্টিতে দেখতে হবে। শুধু হাসপাতালভিত্তিক সেবা দিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কমিউনিটিভিত্তিক সেবার ওপর জোর দিয়ে জানানো হয় যে, সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত স্ক্রিনিং ও প্রতিরোধমূলক সেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগ সফল করতে সরকার একা যথেষ্ট নয়, বরং সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
বিশেষজ্ঞরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার ঘাটতি, কম অগ্রাধিকার এবং দক্ষ জনবলের অভাবকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। সরকারি অবকাঠামোর সঙ্গে বেসরকারি খাতের প্রযুক্তি, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ যুক্ত করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। কমিউনিটি পর্যায় থেকে সহায়ক পেশাজীবী তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয় এবং মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আলোচনায় উঠে আসে যে, সরকারি খাতে জনবলসংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বড় চ্যালেঞ্জ। ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ সার্ভে ২০১৯ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ শতাংশ ও শিশুদের ৯৪.৫ শতাংশ রোগী চিকিৎসার বাইরে রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে ডায়াবেটিস চিকিৎসার মডেলের মতো জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। মানসিক স্বাস্থ্যে সীমিত বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করে কমিউনিটি পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
মানসিক স্বাস্থ্য ও গৃহহীনতা মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রতিটি মানুষের সুস্থতার সঙ্গে জড়িত উল্লেখ করে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়।
সুপারিশ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সমাজসেবা অধিদপ্তরের কার্যক্রমের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার যোগসূত্র তুলে ধরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মানসিক স্বাস্থ্যের কর্নার তৈরির সম্ভাবনার কথা বলা হয়। মানসিক রোগীর চিকিৎসা শেষে পরিবার ও সমাজে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরির চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে পুনর্বাসনে সামাজিক একীভূতকরণ, জীবিকার সুযোগ ও মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। ‘মেন্টাল হেলথ ফার্স্টএইড’ প্রশিক্ষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও আলোচিত হয়।
বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে জনবল, অবকাঠামো, বাজেট ও সেবার বিকেন্দ্রীকরণে ঘাটতির কথা বলা হয়। কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়, টেকসই অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়।
আলোচকরা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো তুলে ধরেন:
- প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করতে হবে।
- চিকিৎসক, নার্স, সাইকোলজিস্ট ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
- মানসিক স্বাস্থ্য আইন ও সংশ্লিষ্ট নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
- সরকারি অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে বেসরকারি খাতের সক্ষমতা দিয়ে সেবার পরিসর বাড়াতে হবে।
- মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও নেতিবাচক ধারণা দূর করতে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
এই গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনদের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। সচেতনতা বৃদ্ধি, দক্ষ জনবল তৈরি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নীতি ও আইনের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা সম্ভব।