বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘দলবাজ’ এবং ‘দলদাস’ শব্দ দুটি বর্তমানে বহুল আলোচিত। এই দুটি ধারণার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। যেখানে ‘দলবাজ’রা দলের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করে, সেখানে ‘দলদাস’রা দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন করে, যা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত। এই প্রবণতাগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
দলবাজি ও এর নেতিবাচক প্রভাব
‘দলবাজ’ হলো এমন ব্যক্তি যারা দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যক্তিগত ফায়দা লোটে। এরা রাজনীতির মূলনীতি বা দলের আদর্শ বোঝে না, বরং দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং অন্যের সম্পদ দখলের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। প্রকট দলবাজি রাজনৈতিক দলকে সিন্ডিকেটে রূপান্তরিত করে সমাজে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির বিষয়টি প্রায়শই আলোচনায় আসে, যেখানে একজন মন্ত্রী এই চাঁদাবাজিকে ‘স্বেচ্ছামূলক’ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ, চাঁদাবাজির ভাগ নীতিনির্ধারকদের কাছেও পৌঁছায়, ফলে খাতে পরিবর্তন আসে না।
দলদাস মানসিকতা ও গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি
অন্যদিকে, ‘দলদাস’ হলো দলের প্রতি অন্ধ অনুগত ব্যক্তি। তারা যুক্তি, বুদ্ধি বা স্বাধীন মতামত বিসর্জন দিয়ে দলের আদেশ, মতবাদ বা স্বার্থ অন্ধভাবে অনুসরণ করে। দলদাসদের দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, একদল দলদাস পদ, পদবি বা পুরস্কারের আশায় দলের প্রতি অনুগত থাকে। দল ক্ষমতা হারালেও তারা দল ত্যাগ করে না, ভবিষ্যতে দল আবার ক্ষমতায় এলে প্রাপ্তিযোগের আশায় থাকে। দ্বিতীয়ত, আরেক প্রকার দলদাস প্রাপ্তিযোগ ছাড়াই দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ থাকে। তারা ‘আদর্শের জন্য দল করি’ বলে দাবি করে এবং দলের বা নেতার মধ্যে ভুল খুঁজে পায় না। তাদের কাছে নেতা অভ্রান্ত, বাকিরা বিভ্রান্ত। এই অন্ধবিশ্বাস ও শর্তহীন আনুগত্য তাদের চিন্তা, বুদ্ধি ও বিবেক দলের কাছে বন্ধক রাখে, যেখানে দল তাদের কাছে ধর্মের মতো। রাজনীতিতে এই অন্ধ অনুকরণ বা দলদাস মানসিকতা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি। যখন ব্যক্তি স্বাধীন চিন্তা ও বিবেক বিসর্জন দিয়ে দলের নির্দেশ অন্ধভাবে অনুসরণ করে, তখন রাজনীতি একরৈখিক ও দমনমূলক হয়।
সংবিধানের ৭০ ধারা ও এর প্রভাব
বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর অনেক নেতা ও কর্মী স্বাধীন মত প্রকাশ না করে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেন। সমালোচনার সুযোগ থাকলেও তারা নীরব ছিলেন। অনেকে মনে করেন, শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশাল ভালো পদক্ষেপ ছিল, কিন্তু বাস্তবায়নের সুযোগ মেলেনি। ‘দলদাস’ তৈরির কারণ হিসেবে সংবিধানের ৭০ ধারাকে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখলেও, সংসদকে ‘পুতুল সংসদে’ পরিণত করেছে বলে অভিযোগ। ৭০ ধারার পক্ষে যুক্তি, পাকিস্তান আমলে ঘন ঘন সরকার পতনের মূল কারণ ছিল দলত্যাগ বা সংসদ সদস্যদের কেনাবেচা, যা এখনো প্রবল ঝুঁকি। তবে, সমালোচকদের মতে, এই ধারা সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতামত প্রকাশে বাধা দিয়ে দলদাস প্রথা টিকিয়ে রাখে।
এই মানসিকতা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে। যখন দল ধর্ম হয়ে ওঠে, তখন সেখান থেকে ব্যক্তিকে সরানো প্রায় অসম্ভব, যা সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অনুকূল নয়।