বিশ্ব ধীরে ধীরে একটি নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে শক্তি-নির্ভর ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে ন্যায় বা আইনের পরিবর্তে শক্তিই শেষ কথা। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ভানও ছেড়ে দিয়েছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাইওয়ানের সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণকে ‘কোনো শক্তি বা কোনো ব্যক্তি ঠেকাতে পারবে না’ বলে মন্তব্য করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যার হুমকি দিয়েছেন। এসব ঘটনা মানবাধিকার, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও আইনের শাসনের মতো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পুরোনো নীতিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধার অভাব নির্দেশ করে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আকাঙ্ক্ষা

তবে, সংঘাতের ভয় বাড়লেও বিশ্বজুড়ে মানুষ বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। রকফেলার ফাউন্ডেশনের পক্ষে ৩৪টি দেশে ৩৬ হাজারের বেশি মানুষের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এই জরিপে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য নিজের দেশের জাতীয় স্বার্থে কিছুটা ছাড় দিতে হলেও তা সমর্থন করবেন বলে জানিয়েছেন। এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, ‘আমার দেশ সবার আগে’—এই ধরনের জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা মানুষ ক্রমেই প্রত্যাখ্যান করছে, যা পৃথিবীকে ‘আমরা’ ও ‘তারা’র অন্তহীন লড়াই হিসেবে দেখে।

প্রতিটি মহাদেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সেই জাতীয়তাবাদী নেতাদের বিরোধিতা করছে, যারা নিজেদের দেশকে গুটিয়ে রাখতে চায়। মানুষ চায় তাদের সরকার মানবাধিকার ও আইনের শাসন রক্ষা করুক, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করুক এবং মানবিক সহায়তায় অর্থ দিক। তারা এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা চায় যা শান্তি ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করবে এবং দারিদ্র্য, রোগ, ক্ষুধা ও নিরক্ষরতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমর্থন বাড়াতে হলে আগে নিজের দেশের সমাজ ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে হবে।

বহুমেরু বিশ্বে নতুন নেতৃত্ব ও চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে পৃথিবী একমেরু ব্যবস্থা থেকে বহুমেরু ব্যবস্থায় যাচ্ছে। আগে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক এজেন্ডা ঠিক করত, এখন চীনের উত্থানসহ একাধিক শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে। জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের তিন প্রধান পারমাণবিক শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। বরং মানুষ কিছু মধ্যম সারির দেশকে বিশ্বের মানুষকে এক করার সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে দেখছে। এই দেশগুলোর মানুষও সহযোগিতা ও নেতৃত্ব দিতে বেশি আগ্রহী।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো শক্তিশালী দেশকে বড় বিষয়ে চাপ দেওয়া কঠিন, কারণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়ে তাদের বিশাল ক্ষমতা রয়েছে। তারা সামরিক হুমকি, শুল্ক, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে অন্য দেশকে চাপ দিতে পারে। রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের বাইরে থাকা দেশগুলোর হাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় উল্লেখযোগ্য ভোট রয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও তাদের বড় ভূমিকা রয়েছে। তাই জলবায়ু সংকট, মানবিক সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করা এবং এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার করা অসম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষও অন্য দেশ থেকে নিজেদের আলাদা করে চলার পক্ষে নয়। তারা সীমান্ত পেরিয়ে সহযোগিতা চায় এবং চায়—যুক্তরাষ্ট্র জোরজবরদস্তি করে নয়, অন্য দেশকে বোঝানোর মাধ্যমে নেতৃত্ব দিক। বহুমেরু বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে চলা বন্ধ করতে হবে। সহযোগিতায় বিশ্বাসী দেশগুলোর উচিত ২০২৭ সালের একটি কর্মসূচিতে একমত হওয়া। বিশ্বের মানুষ একটি ভালো পৃথিবীর আশায় তাকিয়ে আছে।