ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থনীতি ধসে পড়বে: সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সমগ্র দেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিধির আওতায় অনুষ্ঠিত সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিগত শাসনামলে জোরজবরদস্তি করে যাদের কাছ থেকে এই ব্যাংকের শেয়ার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকে অবিলম্বে প্রকৃত ও বৈধ মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে, বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ-এর অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট এবং গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে পুনরায় এই ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে বসানোর ঘটনায় তিনি তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
শেয়ার দখল ও বিপুল অর্থ লোপাটের অভিযোগ
সংসদের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এক বিশেষ সংস্থার মাধ্যমে নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের সঙ্গে থাকা মূল শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার হস্তান্তরে বাধ্য করা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, কীভাবে তারা শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন তা পরবর্তীতে খতিয়ে দেখার বিষয়ে বলা হলেও এই বিষয়টি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে আগেই সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়ে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, এস আলম একা নিজের নামেই এই ব্যাংক থেকে প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। অথচ তিনি যে পরিমাণ শেয়ার কিনেছিলেন, যার মাধ্যমে ব্যাংকটির ৮২ শতাংশ মালিকানা তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, সেগুলোর প্রকৃত বাজারমূল্য ছিল মাত্র ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিনি অন্যান্য সমস্ত ব্যাংক থেকে লুটপাট করা অর্থ দিয়েই আবার এই ব্যাংকের শেয়ার কিনেছিলেন। এভাবেই বিগত সরকারের সরাসরি সহযোগিতায় ব্যাংকটিকে জবরদখল ও ডাকাতি করে চূড়ান্তভাবে দেউলিয়া করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
অবৈধ নিয়োগ ও দুর্নীতির খতিয়ান
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ড. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে কোনো ধরনের পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে, কোনো পরীক্ষা না নিয়ে এবং সামান্যতম নিয়মকানুন না মেনেই অন্তত ১০ হাজার কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের পুনরায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষায় বসার জন্য ডাকা হলেও কোনো কর্মচারী পরীক্ষায় অংশ নেননি।
তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগের জবাব দিয়ে বলেন, ৭০০ কোটি টাকার লোন কোনো নির্দিষ্ট দলের নির্বাচনি ফান্ডে যাওয়ার কথা বলে জামায়াতে ইসলামী-কে বোঝানো হয়ে থাকলে সেই অভিযোগ প্রমাণের জন্য আমি উন্মুক্ত চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। এটি সত্য প্রমাণ করতে পারলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পুরস্কৃত করা উচিত। তবে অন্যায়ের ক্ষেত্রে নিজের নাম থাকলেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। এছাড়া অতীতের মনগড়া বয়ানের ভিত্তিতে সাড়ে ১২ বছর দুঃশাসন চালিয়ে ব্যাংক দখল করা হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান চেয়ারম্যানের ভূমিকা ও অর্থনৈতিক সংকট
বর্তমান ব্যাংক চেয়ারম্যানের অতীত খতিয়ান তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি যখন রংপুর অঞ্চলে ব্যাংকের রিজিওনাল ম্যানেজার ছিলেন, তখন তার বিরুদ্ধে ৫২ লাখ টাকার অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এস আলমের অপকর্মে মদদ দিয়েছিলেন। এর পুরস্কার হিসেবে অন্য একটি ব্যাংক থেকে তার স্ত্রীর নামে কাগুজে প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে সাড়ে তিন কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এমন একজন অসৎ লোককে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আস্থার সংকটের কারণে মাত্র চার দিনে ব্যাংকটি থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে অর্থনীতি বড় সংকটে পড়বে। তাই দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থে এবং অর্থব্যবস্থা বাঁচাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো আহ্বান জানান তিনি।
#অর্থনীতি #ব্যাংকিং_খাত #সংসদ #বাংলাদেশ