প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ছয় মাস অতিক্রম করার পর মন্ত্রিসভায় রদবদল ও নতুন নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এই পদক্ষেপকে মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে চারজন নতুন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ পেয়েছেন। একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং একজন মন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। এই রদবদলের ফলে মন্ত্রিসভার আকার বৃদ্ধি পেয়ে ৫১ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় আরও ১৩ জন উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী রয়েছেন, যা সব মিলিয়ে মোট ৬৪ জন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম মন্ত্রিসভা। সরকার গঠনের প্রথম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে, ছয় মাস পর মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম ও দক্ষতার মূল্যায়নের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভায় রদবদল ঘটবে। তবে বাস্তবে যা ঘটেছে, তা মূলত নতুন নিয়োগ এবং সীমিত কিছু পরিবর্তন। যে দুটি রদবদল হয়েছে, তা পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ঘটেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মন্ত্রিসভার রদবদল ও মূল্যায়নের প্রশ্ন বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে সরিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এবং ওই মন্ত্রীর অধীনে থাকা প্রতিমন্ত্রীকে পূর্ণ মন্ত্রী করা হয়েছে। এই পরিবর্তন কি দায়িত্ব পালনে মন্ত্রীর ব্যর্থতা বা প্রতিমন্ত্রীর সাফল্যের মূল্যায়ন, নাকি অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন, তা স্পষ্ট নয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়ে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। এটিকে পদোন্নতি নাকি মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। যদি পারফরম্যান্স ভালো হয়ে থাকে, তাহলে কেন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রাখা হলো না? আর যদি ভালো না হয়ে থাকে, তাহলে কেন তাঁকে একই মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হলো, এই প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনটি প্রধান কাজে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছিল: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। এই তিন ক্ষেত্রে সরকার যে পুরোপুরি সফল হতে পারেনি, তা স্পষ্ট। যদিও মন্ত্রিসভায় কে থাকবেন বা থাকবেন না, অথবা কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন, তা প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে, তবুও ছয় মাস পর পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ইঙ্গিত দেওয়ায় জনগণ এই রদবদলের সঙ্গে মূল্যায়নের বিষয়টি মিলিয়ে দেখতে আগ্রহী। তবে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো বার্তা না পাওয়ায় এটিকে নিছক মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ বা পুনর্বিন্যাস হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। একজন মন্ত্রীর পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা সহজ কাজ নয়। লক্ষ্য অর্জনে মন্ত্রণালয়ের সাফল্য, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সিদ্ধান্তের মান, প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থ ব্যবহারের দক্ষতা, অনিয়মের অভিযোগ এবং জনগণের সন্তুষ্টির মতো বিষয়গুলো সাধারণত বিবেচনা করা হয়। গত ছয় মাসে কয়েকজন মন্ত্রীর কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিছু সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতিমূলক স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠেছে। বড় মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা ও চ্যালেঞ্জ এত বড় মন্ত্রিসভা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার ভূমিকা অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি করে। এ কারণে ছোট, কার্যকর ও দক্ষ মন্ত্রিসভার পক্ষে মত দেন সরকার ও রাজনীতিবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা। রাজনৈতিক সরকারের নানা বিবেচনা থাকে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে ছিল এবং দলের অনেক নেতা অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সম্ভবত এর প্রতিদান বা মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে গিয়েই মন্ত্রিসভার আকার এত বড় হয়েছে। তবে কার্যকরভাবে সরকার পরিচালনা ও দক্ষতার দিকটিই সরকারের প্রথম বিবেচনা হওয়া উচিত।