হিমবাহধসে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী ঢলের পর উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নেপাল সরকার বিদেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলকে অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে বিদেশি সহায়তা প্রত্যাখ্যান করার পর, কূটনৈতিক চাপ এবং নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এই অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। এই ভয়াবহ দুর্যোগে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।

গত বুধবারের ভয়াবহ দুর্যোগের পর নেপাল আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তাব পেয়েছিল। তবে দেশটির সরকার সে সময় জানিয়েছিল যে, তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অন্য কোনো দেশের সহায়তার প্রয়োজন নেই, বরং পুনর্গঠনের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু যেসব দেশের নাগরিকেরা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, সেসব দেশ নিজেদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল নেপালে পাঠানোর অনুমতি দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। এই কূটনৈতিক চাপের মুখে নেপাল সরকার তাদের পূর্বের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।

ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলকে সহায়তা করার অনুমতি দিতে নেপাল সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছিল। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের (এনডিএমসি) মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেপাল সরকার এখন এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি দল পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই দলগুলোর সদস্যরা টানেল থেকে উদ্ধারকাজ এবং ডিএনএ ও ফরেনসিক পরীক্ষায় অভিজ্ঞ।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী প্রাথমিকভাবে বলেছিলেন যে, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে এবং আপাতত বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে পরে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ব্যাপক চাপ ছিল, কারণ এ দুর্যোগে তাদের নাগরিকেরাও নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমিতসংখ্যক বিশেষজ্ঞকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহধসের পর গত বুধবার ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদী দিয়ে প্রলয়ংকরী ঢল নেমে আসে। এ পর্যন্ত ৫৭৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিব্বতে আরও পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি। নেপালের পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিখোঁজ রয়েছেন ভারতীয়রা। এই দুর্যোগে মোট ৩১টি দেশের নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন।

কয়েকটি দেশ প্রকাশ্যেই নেপালের কাছে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত একটি উদ্ধারকারী দল ও একটি চিকিৎসক দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং বিভিন্ন ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউনও নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে কথা বলেন এবং নেপালে থাকা দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নেপালের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশি সহায়তা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, সহায়তার জন্য প্রাথমিকভাবে তিনটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া হচ্ছে।