ম্যানিলার রিজাল উদ্যান, যা একসময় বাগুমবায়ান উদ্যান নামে পরিচিত ছিল, ১৮৯৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল। স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ফিলিপাইনের জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হোসে রিজালকে এই স্থানেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পেশায় চক্ষুবিশেষজ্ঞ, লেখক ও কবি রিজাল তাঁর লেখনীর মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেছিলেন, যা স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের কাছে তাঁকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছিল।
কোর্ট মার্শালের বিচারে রাষ্ট্রদ্রোহ, বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁর মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত হয়। গভর্নর জেনারেল ক্যামিলো ডি পোলাভিয়েজা বিশ্বাস করতেন, রিজালকে সরিয়ে দিলেই স্বাধীনতার স্বপ্ন থেমে যাবে। কিন্তু তাঁর এই আত্মত্যাগ ফিলিপাইনের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গকে আরও প্রজ্বলিত করে তোলে।
হোসে রিজালের আত্মত্যাগ
১৮৯৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে বাগুমবায়ান উদ্যানে সৈনিকদের একটি ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়ানো ছিলেন হোসে রিজাল। তাঁর চোখে কোনো ভয় বা অনিশ্চয়তা ছিল না। অপলক দৃষ্টিতে তিনি বন্দুকধারীদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সকাল ৭টা ৩ মিনিটে বন্দুকের শব্দ গর্জে ওঠে। ইতিহাস অনুযায়ী, মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ঠিক আগে রিজাল মৃদুস্বরে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘Consummatum est’, ল্যাটিন এই বাক্যের অর্থ ‘সব সম্পন্ন হলো’ অথবা ‘সব শেষ হলো’। এই বাক্যটি যেন ক্রুশবিদ্ধ যিশুর শেষ উচ্চারণের প্রতিধ্বনি ছিল।
রিজালের জীবন শেষ হলেও তাঁর শুরু করা স্বাধীনতার পথচলা থামেনি। তাঁর আত্মত্যাগের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই স্প্যানিশ শাসনের ভিত্তি কেঁপে ওঠে এবং ঔপনিবেশিক শক্তি ফিলিপাইন থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়। যদিও ফিলিপিনোদের প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পেতে আরও কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হয়েছিল, তবু রিজালের রক্তেই যেন স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল। যে উদ্যানে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল, ইতিহাসের এক বিস্ময়কর পরিহাস হলো, স্বাধীনতা-উদ্যাপনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনও সেই একই স্থানে হয়েছে। বর্তমানে এই উদ্যানটি রিজাল পার্ক নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
রিজাল পার্ক: ইতিহাসের সাক্ষী
রিজাল পার্ক ম্যানিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যা ১৪০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এটি শুধু একটি সবুজ উদ্যান নয়, বরং ফিলিপাইনের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু। স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের বিরুদ্ধে গণ–আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এই উদ্যানে রচিত হয়েছে। বিশ্ব যক্ষ্মা দিবসে প্রায় ছয় হাজার মানুষের অংশগ্রহণে বিশ্বের বৃহত্তম মানব-ফুসফুসের প্রতিকৃতিও এখানে তৈরি হয়েছিল। ২০০৫ সালের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ান গেমসের উদ্বোধন থেকে শুরু করে ২০১০ সালের ম্যানিলা জিম্মি সংকট পর্যন্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই এই উদ্যানকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
১৯১২ সাল থেকে ফিলিপাইনের এই জাতীয় বীর হোসে রিজাল রিজাল পার্কের সমাধিসৌধে শায়িত আছেন। সুউচ্চ স্মৃতিস্তম্ভটি তাঁর আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। স্মৃতিস্তম্ভের ঠিক বিপরীতে একটি বিশাল পতাকাস্তম্ভ রয়েছে, যা দেড় শ ফুট উঁচু। ১৯৪৬ সালের ৪ জুলাই দীর্ঘ ঔপনিবেশিক অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন ফিলিপাইনের পতাকা প্রথমবারের মতো এখানেই উড়েছিল। এই স্তম্ভটি একটি জাতির স্বাধীনতার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিদায়, প্রিয় স্বদেশ আমার, সূর্যচুম্বিত ভূমি,
প্রাচ্যের সাগরের মুক্তা তুমি, হারানো স্বর্গভূমি।
আনন্দভরে সঁপে দিই আজ জীবন আমার সারা,
দুঃখে-দহনে ক্ষয়িত হলেও নেই তাতে কোনো হারা।
আরও যদি হতো উজ্জ্বল, নবীন, মহিমাময়,
তোমারই মঙ্গল তরে দিতাম তাও অকুণ্ঠ হৃদয়।
রিজালের জীবন প্রমাণ করে গেছে যে মানুষের মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্নের মৃত্যু হয় না। তাঁর আত্মত্যাগ ফিলিপাইনের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল এবং আজও তা অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত।