ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (এফএসএসএআই) প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়র মোড়কের সামনের দিকে সতর্কীকরণ লেবেল দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। খাবারে অতিরিক্ত চিনি, চর্বি বা লবণ থাকলে তা লেবেলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার এই উদ্যোগের বিষয়ে সংস্থাটির এত দিন আপত্তি ছিল। তবে জনরোষ ও সুপ্রিম কোর্টের চাপের মুখে এফএসএসএআই তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন করে সতর্কীকরণ লেবেল চালুর প্রস্তাব দিয়েছে।
ভারতের বিশাল খাদ্যবাজারে এই সিদ্ধান্ত খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বড় পরিবর্তন আনবে। কোকাকোলা, নেসলে ও পেপসিকোর মতো শিল্পগোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের লেবেলের বিরোধিতা করে আসছে, তাদের যুক্তি ছিল যে এসব লেবেল ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করে। অন্যদিকে, স্থূলতার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী ও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বারবার এ ধরনের লেবেল চালুর আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন।
সতর্কীকরণ লেবেলের প্রস্তাবনা
এফএসএসএআই সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া এক আবেদনে খাবারের প্যাকেটের সামনের দিকে ‘লাল’ রঙের ষড়্ভুজ আকৃতির সতর্কীকরণ চিহ্ন দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। কোনো খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, চিনি বা লবণের মধ্যে অন্তত দুটি উপাদানের পরিমাণ বেশি হলে এই চিহ্ন ব্যবহার করা হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার কয়েক বছর ধরে সতর্কীকরণ লেবেল চালুর চেষ্টা করলেও, চলতি বছর খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তির কারণে একটি প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছিল।
এফএসএসএআই তাদের আবেদনে বলেছে, সতর্কীকরণ লেবেলে ‘উচ্চ চর্বি’, ‘উচ্চ চিনি’, ‘উচ্চ লবণ’ এবং অথবা ‘অত্যধিক মিষ্টিযুক্ত পানীয়’র মতো ঘোষণা থাকবে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান বেশি থাকা পণ্যগুলো ভোক্তারা সহজেই শনাক্ত করতে পারবেন। সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে যে, এই ব্যবস্থা বিশেষ করে শিশু ও জনগোষ্ঠীর অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ অংশের মানুষকে সচেতনভাবে খাবার বেছে নিতে সহায়তা করবে। এই আবেদনটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে এর একটি অনুলিপি রয়টার্সের সাংবাদিকদের হাতে এসেছে।
শিল্পের আপত্তি ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা
ভারতের স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্কীকরণ লেবেল চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের করা আবেদনের শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট চলতি মাসের শুরুতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বর্তমানে ভারতে খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্যাকেটের পেছনে শুধু উপাদান ও মৌলিক পুষ্টিগুণের তথ্য উল্লেখ করতে হয়। অলাভজনক সংগঠন ‘থ্রি-এস অ্যান্ড আওয়ার হেলথ’-এর প্রধান আইনজীবী রাজীব শঙ্কর দ্বিবেদী জানিয়েছেন, তাঁরা সরকারের প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন।
গত মার্চে খাদ্যশিল্পের নির্বাহীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, এ ধরনের সতর্কীকরণ লেবেল বিভ্রান্তিকর ও অকার্যকর। কোকাকোলা ইন্ডিয়ার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী মিলি ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন,
কোনো ভোক্তা যদি আগে থেকে খাবারের উপাদানের তালিকা না পড়েন, তাহলে প্যাকেটে কোনো প্রতীক বা চিহ্ন দেখে তাঁর খাদ্যাভ্যাস উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে—এমনটা ভাবা ‘খুবই সরল’ ধারণা।
তিনি আরও বলেন, সতর্কীকরণ লেবেল অর্থহীন।
গত আগস্টে এফএসএসএআই সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছিল যে, প্যাকেটের গায়ে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ লেবেল চালু করা ‘কঠিন’। এর আগে আদালত বলেছিলেন, ভারত ইসরায়েলের মতো লেবেল ব্যবস্থা বিবেচনা করতে পারে। চলতি মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, ‘বিশ্বের জানা উচিত, ভারত তার নাগরিকদের সার্বিক স্বাস্থ্য নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।’ এফএসএসএআই জানিয়েছে, খাদ্যশিল্পকে প্রস্তুতির জন্য সময় দিতে ধাপে ধাপে এই লেবেল ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং একটি মাত্র উপাদান দিয়ে তৈরি খাবার এ ব্যবস্থার আওতামুক্ত থাকবে।