রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ: জবাবদিহি, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রত্যয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে আলোচকরা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে, গুমের অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) আয়োজিত এই সেমিনারে বক্তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং গুমের পুনরাবৃত্তি রোধে দীর্ঘমেয়াদী ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভূরাজনৈতিক কৌশল ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর সেমিনারে বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আগ্রহ রয়েছে। তিনি বর্তমান সরকারের গঠিত কমিটিকে স্বাগত জানালেও অতীতে বিভিন্ন কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে ঘাটতি ছিল। তাই এই কমিটির কাজের নিয়মিত অনুসরণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে দেখার জন্য একটি ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি’ গঠনের প্রস্তাব দেন। ফজলে এলাহী আকবর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ভারতের কালাদান প্রকল্পের নিরাপত্তা ও বাস্তবায়ন রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই বিষয়টিকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে ভারতকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আরও সক্রিয় করা সম্ভব। একইভাবে, চীনের সঙ্গে যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উদ্যোগও বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, মিয়ানমারের ভূখণ্ডে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ সীমিত এবং আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব রয়েছে। মিয়ানমারকে ঘিরে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোর স্বার্থ বিদ্যমান। এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করতে হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল মানবিক বা দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে দেখলে এর সমাধান হবে না; এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি জড়িয়ে গেছে। মালাক্কা প্রণালির বিকল্প জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামো, গ্যাস পাইপলাইন ও বন্দর ঘিরে বিভিন্ন দেশের স্বার্থ তৈরি হওয়ায় মিয়ানমারের গুরুত্ব বেড়েছে। তাই বাংলাদেশের এখন একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন, যার মূল লক্ষ্য হবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন। মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ছাড়া প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের রাখার কথা না বলে তাদের প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। ক্যাম্পগুলোতে অস্ত্র, মাদক, মানব পাচার ও সংঘাত বিস্তার ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন তিনি। গুমের অভিযোগ ও জবাবদিহিতা গুম প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, আইনবহির্ভূত নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করা একজন সৈনিকের দায়িত্ব হলেও বিগত সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর কিছু সদস্য গুমের ঘটনায় জড়িত হয়েছেন, যা তাঁকে বিব্রত করে। রাষ্ট্রে জবাবদিহি, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে। গুমের শিকার বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী গুমের অভিযোগের তদন্তে স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার ওপর জোর দেন। তিনি প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বিভাগ, সংস্থা বা বাহিনী ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। কোনো ঘটনায় একাধিক বাহিনী বা সংস্থা জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিজস্ব কমিটি গঠন করে স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারবে। হুম্মাম কাদের চৌধুরী তাঁর নিজের গুমের ঘটনা তুলে ধরে বলেন, তাঁকে প্রথমে ডিবি তুলে নিয়ে যায় এবং পরে ডিজিএফআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তিনি বলেন, গুমের ঘটনায় শুধু সরাসরি জড়িত ব্যক্তিই নয়, আদেশদাতা ও ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’র আওতায় থাকা কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে।