ঢাকার মুগদার এক জীর্ণ ভবনে ভাসমান যৌনকর্মী নারীদের জন্য সেলাই ও বিকল্প কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ চলছে, যেখানে তাদের সন্তানদের নিরাপদ দেখাশোনা ও চিকিৎসাসেবাও প্রদান করা হচ্ছে। আয়োজনটি গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন বাস্তবায়ন করছে, সহযোগী হিসেবে আছে কল্যাণময়ী নারী সংঘ। শুরুতে স্বল্পসংখ্যক নারী নিয়ে পরিক্রমা শুরু হলেও ধীরে ধীরে ব্যাচ বাড়ছে ও শতাধিক নারী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন।
প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও কার্যক্রম
ভবনের নিচতলায় ছোট কক্ষগুলোতে সারিবদ্ধ সেলাই মেশিন, প্রশিক্ষণার্থীর হাতে সার্টিফিকেট আর পাশে স্তূপ করা খাদ্যসামগ্রী দেখা যায়। শুধু সেলাই শেখানোই হচ্ছেনা; ব্যবসা শুরু, বিকল্প উপার্জন এবং সন্তানদের নিরাপত্তার দায়িত্বও নেয়া হচ্ছে। শুরুতে ‘প্রজেক্ট লড়াই’ নামে নিজস্ব অনুদানে আটজন নারী নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল। বর্তমানে ২৭তম ব্যাচ চলছে এবং প্রতি ব্যাচে গড়ে ২২ জন প্রশিক্ষণ নেয়। প্রতিবেদনে বলা আছে, এখন পর্যন্ত ২৪৯ জন নারী এই প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন।
কারা কাজ করছেন, নেতৃত্বের ভূমিকা
এই পুনর্বাসন কার্যক্রমে বিশেষভাবে কাজ করছেন গিভ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ ফাহমি ও কল্যাণময়ী নারী সংঘের সভাপতি রিনা আক্তার। আয়োজনের শুরু থেকেই প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীরা বারবার ‘রিনা আপা’ নামটি উচ্চারণ করেন। রিনা আক্তার নিজের জীবনের স্মৃতি জানিয়ে বলেন—
‘আমার তো তখন কিছুই বোঝার বয়স না। তারা আমাকে এক ব্রথেল থেকে আরেক ব্রথেলে বিক্রি করতে থাকে। প্রথমে ফরিদপুর, এরপর ময়মনসিংহ…তারপর ওখান থেকে একদিন পালিয়ে এসে সোজা ঢাকার সদরঘাটে চলে আসি। ভাসমান কাজেই ছিলাম।’
আরও বলা হয়েছে, সংগঠনটির একটি বাছাইপ্রক্রিয়া আছে যার মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীদের নির্বাচন করা হয়।
চ্যালেঞ্জ, ফলাফল ও সেবা
প্রশিক্ষণ-পরবর্তী বাস্তবতা মসৃণ নয়। প্রতিবেদনে ফাহমির উদ্ধৃতি রয়েছে—
‘একজন নারী যখন অল্প বয়সে এই পেশায় আসেন, তখন তাঁর মাসে ২০ হাজার থেকে ৩৫-৪০ হাজার টাকা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় থাকে। কিন্তু এনজিও থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্থানীয় কোনো গার্মেন্টসে চাকরি পেলে তাঁদের মাসিক বেতন হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার মতো।’
পেশাগত আয়ের পার্থক্যের ফলে সবাই স্থায়ীভাবে পুরনো জীবন ত্যাগ করতে পারেন না; রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী স্থায়ীভাবে আগের পেশা ছেড়েছেন, বাকি প্রায় ৩৫ শতাংশ পুরোনো জগতে ফিরে গেছেন বা ফেরার চেষ্টায় রয়েছেন।
চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষাও এই প্রোগ্রামের অংশ। দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের ফলে নানা জটিলতা দেখা যায়; সংগঠনগুলো বিনামূল্যে মেডিকেল কেয়ার ও এইচআইভি স্ক্রিনিং, সার্ভাইকাল ও স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা করছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও উপসংহার
প্রতিষ্ঠানগুলো মুগদা ছাড়াও সদরঘাট, হোটেলপাড়ার ভাসমান নারীদের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রেখেছে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য আস্থা শেল্টার হোমের মতো উদ্যোগ চালু আছে, যাতে তাদের সন্তানদের জীবন নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকে। পেশায় বন্দি এই নারীরা সমাজের একান্ত প্রান্ত থেকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে ধাপে ধাপে এগোচ্ছে; পুনর্বাসন ও টেকসই কর্মসংস্থানের চেষ্টা চলেছে, এবং তাদের জীবন মান উন্নত করার লক্ষ্যই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।