বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ, বৈদেশিক অর্থায়নের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট, ক্রমবর্ধমান ঋণসেবা ব্যয় এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতের দুর্বলতার কারণে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। সম্প্রতি দুটি আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন এই বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে এবং বাজেট স্বচ্ছতা ও আর্থিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন ও সুপারিশ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৬ সালের ফিসকাল ট্রান্সপারেন্সি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বাজেট নথি, সরকারি রাজস্ব ও ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র, নিরীক্ষা, সরকারি ক্রয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণসংক্রান্ত চুক্তির তথ্য আরও স্বচ্ছ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে তথ্যের পূর্ণতা, সময়মতো প্রকাশ এবং জনসাধারণের জন্য সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ওপেন বাজেট সার্ভের সর্বশেষ ২০২৫ সালের মূল্যায়নেও একই চিত্র পাওয়া যায়, যেখানে বাংলাদেশের বাজেট স্বচ্ছতার স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৩৭। পর্যাপ্ত বাজেট তথ্য প্রকাশের মানদণ্ড হিসেবে ৬১ বা তার বেশি স্কোরকে ধরা হয়। এই ফলাফলগুলো সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় জরুরি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। অর্থ ব্যবস্থাপনার মূল ক্ষেত্রসমূহে সংস্কার বাজেটকে কেবল আয় ও ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব হিসেবে না দেখে, সরকারি ঋণ, গ্যারান্টি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা, সম্ভাব্য দায়, বিশেষ তহবিল, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রকল্প এবং আধা রাজস্ব কার্যক্রম—সবকিছুকে একটি সমন্বিত আর্থিক কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন। এটি রাষ্ট্রের প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি বোঝার জন্য অপরিহার্য। বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে হবে। বাজেটে নির্ধারিত রাজস্ব ও ব্যয়ের লক্ষ্যের সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের বড় পার্থক্য হলে বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই রাজস্ব পূর্বাভাস, ব্যয় পরিকল্পনা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসকে আরও বাস্তবভিত্তিক করা জরুরি। বছরের মাঝামাঝি বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং বছর শেষে প্রকৃত আয়-ব্যয়ের পার্থক্যের কারণ প্রকাশ করা প্রয়োজন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক জবাবদিহি বৃদ্ধি করা আবশ্যক। কেন্দ্রীয় বাজেটের বাইরে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন নিয়মিত, নির্ভরযোগ্য ও সময়মতো প্রকাশ না হলে সরকারের সামগ্রিক দায় বোঝা কঠিন। তাই আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হিসাব ও আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা দরকার। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আরও বাড়াতে হবে। ই-জিপি চালু হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও, কোন প্রতিষ্ঠান কী কিনছে, কত দামে কিনছে, কার সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে, চুক্তির মূল্য বা মেয়াদ কতবার পরিবর্তিত হচ্ছে এবং প্রকল্প কত ব্যয়ে শেষ হচ্ছে—এসব তথ্য সহজে অনুসন্ধানযোগ্য হওয়া উচিত। পুরো ক্রয়চক্রের তথ্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। বড় প্রকল্পের আর্থিক দায় সম্পর্কে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা জরুরি। প্রাথমিক ব্যয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, ঋণ পরিশোধের দায় ও সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প অনুমোদনের আগে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি ও সম্ভাব্য দায় প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। নিরীক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। নিরীক্ষা প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, সুপারিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবও জনসমক্ষে থাকা উচিত। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পর্যাপ্ত জনবল, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা দিতে হবে এবং সুপারিশ বাস্তবায়নেরও নিয়মিত অনুসরণ প্রয়োজন। সংস্কারের ধাপসমূহ সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার সংস্কার দুটি ধাপে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। স্বল্প মেয়াদে (এক থেকে দুই বছরের মধ্যে) প্রাক্বাজেট বিবৃতি, মধ্য-বছরের বাজেট পর্যালোচনা ও বছরের শেষের আর্থিক প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ করা যেতে পারে। সরকারি গ্যারান্টি ও সম্ভাব্য দায়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করা এবং সরকারি ক্রয় ও বড় প্রকল্পের চুক্তির তথ্য উন্মুক্ত করাও দ্রুত ফল দিতে পারে। মধ্য মেয়াদে (পাঁচ থেকে দশ বছরের জন্য) একটি সমন্বিত সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা সংস্কার কর্মসূচি প্রয়োজন।