জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয়

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিশাল সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সম্প্রতি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাব এবং গ্রহণযোগ্যতার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে এই ঐতিহাসিক বিজয়কে।

ভোটাভুটি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জয়ের সমীকরণ

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে বিশ্বজুড়ে মোট ১৯০টি সদস্য রাষ্ট্র সরাসরি অংশ নেয়। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ নির্বাচনে ড. খলিলুর রহমান অর্জন করেন ৯৯টি দেশের সমর্থন ও মূল্যবান ভোট। অন্যদিকে, তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের অভিজ্ঞ প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস. কাকৌরিস পান ৯১টি দেশের ভোট। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার এই নিরঙ্কুশ জয় নিশ্চিত করতে বেশ দীর্ঘ সময় ধরে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা। তাদের এই নিরলস প্রচেষ্টা বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠপর্যায়ে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখে বিজয়ের পথ সুগম করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের ওপর তাদের আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা ভবিষ্যতে বহুপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

আঞ্চলিক ঘূর্ণন নীতি ও প্রচারণার পটভূমি

জাতিসংঘের বহুল প্রচলিত ও সর্বজনrecognized আঞ্চলিক রোটেশন বা ঘূর্ণন পদ্ধতি অনুসরণে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদটি এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত ছিল। এই মর্যাদাপূর্ণ পদের জন্য বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শুরুতেই প্রার্থিতা ঘোষণা করে। প্রথমদিকে ফিলিস্তিন এই পদের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে প্রার্থিতা ঘোষণা করলেও পরবর্তীতে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে চুড়ান্ত লড়াইটি কেবল বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের প্রার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

উল্লেখ্য যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে প্রায় চার বছর আগে থেকেই সুপরিকল্পিতভাবে এই নির্বাচনের জন্য জোরালো কূটনৈতিক প্রচারণা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। ধারাবাহিক যোগাযোগের সুফল হিসেবেই আজকের এই বহুল কাঙ্ক্ষিত ও গৌরবময় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

দীর্ঘ চার দশক পর ঐতিহাসিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

এই গৌরবময় বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রায় চার দশক পর আবারও বাংলাদেশের কোনো যোগ্য প্রতিনিধি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সর্বোচ্চ সভাপতির দায়িত্ব পালনের অনন্য সুযোগ পেলেন। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বিশ্ব সংস্থার সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ চার দশক পর আবারও বিশ্বসভার শীর্ষ পদে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হওয়া দেশের সার্বিক বহুপাক্ষিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এক বিশাল ও অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভোটাভুটির মাধ্যমে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। একটি করে সমান ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রার্থী এই দায়িত্বে আসীন হয়ে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে মূল ভূমিকা পালন করেন।

#জাতিসংঘ #বাংলাদেশ #কূটনীতি #আন্তর্জাতিক