আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রাক্কালে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আয়োজিত এক সেমিনারে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছে। রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় ভুক্তভোগীরা বর্তমান সরকারের সময়েও নতুন করে গুমের ঘটনা ঘটছে বলে দাবি করেছেন। তারা নতুন ‘গুম প্রতিরোধ আইন’ নিয়েও গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, এটিকে ‘বস্তা পচা আইন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সেমিনারে প্রায় ২০টি গুমের শিকার পরিবারের সদস্য এবং গুম থেকে ফিরে আসা দুজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং তাদের স্বজনদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানোর পাশাপাশি গুমের তদন্ত স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ অনুষ্ঠানে বাগেরহাটের নিখোঁজ মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা খাতুন অভিযোগ করেন, চলতি বছরের ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় জয়মনির ঠোটা এলাকা থেকে সাদাপোশাকে থাকা দুজন ব্যক্তি তার স্বামী মিরাজকে কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যায়। মুক্তা খাতুন নিজে এই ঘটনা দেখেছেন বলে দাবি করেন। পরবর্তীতে কোস্টগার্ড কর্তৃপক্ষ মিরাজ তাদের কাছে নেই বলে অস্বীকার করে। মুক্তা খাতুন তার স্বামীকে ফেরত চেয়েছেন। আনিশা ইসলাম ইনশা জানান, ২০১৯ সালের ১৯ জুন তার বাবা ইসমাইল হোসেন বাতেন মিরপুর–১ থেকে গুম হন এবং সাত বছরেও তার কোনো খোঁজ মেলেনি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৫ আগস্টের পরেও গুমের ঘটনা ঘটছে। আনিশা এই ঘটনার এবং নতুন আইনের নিন্দা জানিয়ে তার বাবা ও ছোট্ট মাহির শেখের বাবাকে ফেরত চেয়েছেন। আমেনা আক্তার বলেন, তার স্বামী ফিরোজ খান বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির (বিএনপি) রাজনীতি করতেন এবং ২০১২ সালের ২৪ আগস্ট তৎকালীন সরকার তাকে গুম করে। আমেনা অভিযোগ করেন, সেই সময় র্যাব তাকে গুম করে এবং আজও তার সন্ধান মেলেনি। ‘অধিকার’ এর বিশ্লেষণ ও দাবি মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি পরিচালক তাসনিম ফারহানা লিখিত বক্তব্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে এই আইনের খসড়া উত্থাপন করা হয়। তাসনিম ফারহানা বলেন, এই আইনের ১৪(৩) ধারায় শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনী পরিচালনা করতে পারবে না এবং সরকার অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তঃবাহিনীর তদন্ত দলের কাছে তদন্তভার অর্পণ করতে পারবে। তবে তিনি এটিকে বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন, কারণ শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুমের তদন্ত পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাসনিম ফারহানা আরও উল্লেখ করেন, এই আইনে অভিযোগটি আদালতে মিথ্যা বিবেচিত হলে অভিযোগকারীর পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে, যা বিচারহীনতার পথকে আরও প্রশস্ত করবে। অধিকারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে তিন দফা দাবি জানানো হয়েছে: গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর দিতে হবে; গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্ত্রী-সন্তানেরা যাতে তাদের ব্যাংক হিসাব পরিচালনাসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে; এবং গুমের পর ফেরত আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। আইনজীবী ও সংসদ সদস্যদের মন্তব্য সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম নতুন আইনটিকে ‘বস্তা পচা আইন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি আরও বেশি গুম ও খুনের ছাড়পত্র দিচ্ছে। তার মতে, এই আইনে গুমের সুষ্ঠু তদন্তের বিধান নেই; বরং গুমের অভিযোগ আনলে পরিবারকেও জেলে যেতে হবে বলে ভয় দেখানো হচ্ছে। তিনি এক বাহিনীর অভিযোগ আরেক বাহিনী তদন্ত করার বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।