আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন যে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ছয় মাসে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা রাজনৈতিক নিপীড়নের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তিনি বাগেরহাটের মোংলায় নিখোঁজ হওয়া মিরাজ শেখের ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত পরিচালিত হয়েছে। তদন্তে মিরাজ শেখের বনদস্যুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিরাজ শেখের অতীত রেকর্ড এবং তাঁর বাবা ও দাদার রেকর্ডের একই রকম হওয়ার কথা উল্লেখ করে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি। রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাঁদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই অনুষ্ঠানে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬ প্রণয়নের কথা জানান। তিনি বলেন, শুধু কমিশন গঠন করে গুমের সমাধান সম্ভব নয়, বরং প্রতিটি ভুক্তভোগী যাতে আদালতে গিয়ে বিচার ও প্রতিকার পান, সে লক্ষ্যেই এই আইন করা হয়েছে। আইনে গুমের সংজ্ঞা, অপরাধের ধরন, শাস্তি এবং তদন্তের পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। নতুন আইনের ইতিবাচক দিক ও প্রস্তাবিত বিধান মন্ত্রী নতুন আইনের বিভিন্ন ইতিবাচক দিক তুলে ধরে বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তি ফিরে না এলে তাঁর উত্তরাধিকারীরা যাতে সম্পত্তির অধিকার পান এবং পরিবার চালাতে পারেন, সে ব্যবস্থা আইনে রাখা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণের বিধানও রয়েছে। দায়ীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, আইনটি বিভিন্ন পক্ষ, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, কূটনৈতিক মিশন এবং মানবাধিকার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের চেষ্টা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আইনটি সংশোধনের সুযোগ থাকবে। তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রসঙ্গে বলেন, নতুন আইনটি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে করা হয়েছে এবং কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কারে কাজ করছে। বাহিনীগুলোর মনোবল ও পেশাদারত্ব বাড়ানো হচ্ছে এবং শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষায়িত বাহিনী, গোয়েন্দা সহায়তা ও সাইবার গোয়েন্দা সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব বাহিনীতে মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। স্বাধীন তদন্তের দাবি ও মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ অনুষ্ঠানে গুমসংক্রান্ত সাবেক তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য শুনেছেন এবং ডিজিটাল তথ্য যাচাই করেছেন। সব মিলিয়ে তাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা দেখতে পেয়েছেন, অথচ এখন পর্যন্ত কার্যকর আইনি পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তিনি অভিযোগ করেন যে, অভিযোগ অস্বীকার করতে বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে এবং স্থানীয় মানুষ ও সাক্ষীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। নূর খান লিটন আরও বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিরা প্রতিটি মুহূর্তে অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুভয়ের মধ্যে থাকেন, তাই রাজনৈতিক কারণে তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করা তাঁদের কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেয়। নতুন আইন প্রসঙ্গে নূর খান লিটন স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, তদন্তের দায়িত্ব কোনোভাবেই অভিযুক্ত বাহিনীর অধীন থাকা উচিত নয়। মানবাধিকার কমিশনের অধীন, পুলিশের বাইরে কোনো স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো স্বতন্ত্র ব্যবস্থায় তদন্ত করতে হবে।